Posted in Bengali, short shory

পুতুল বিভ্রাট

গড়িয়াহাট থেকে অল্প এগোলেই চোখে পরবে একটি সুদৃশ্য, দ্বিতল বাড়ি। বাড়িটির উপরতলায় বিরক্ত পাপিয়া দেবী রান্নার কাজে ব্যস্ত। সবিতাটা আবার ডুব মেরেছে। পাশের ঘরে তার স্বামী নির্বিকার চিত্তে সকালের কাগজটা এই  নিয়ে ন’নম্বরবার  উল্টে পাল্টে দেখছেন, বৌয়ের খিটখিট শোনার থেকে এই অকাজটা করাটা ঢের  বেশি শ্রেয় মনে হয়েছে তার। বাড়ির নিচতলা এই প্রবীণ দম্পতি  ভাড়া দিয়েছেন তিনটি তরুণীকে। কলকাতার বিভিন্ন কলেজের ছাত্রী এরা। বাড়ি সকলেরই দূরে। একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর পাপিয়া দেবীরও তাদের সাথে হৈহুল্লোড় করে সময়টা ভালো কাটে, আবার একটু উপার্জনও হয়ে যায়।  

 

নিচের ঘরে বিছানার উপর একটি গল্পের বই নিয়ে উপুড় হয়ে পরে আছে ঝিলিক। রবিবার সকাল সকাল মৌ আর সৃজা গেছে টিউশন পড়তে।  নিচতলায় সে এখন একাই।  সারাদিন তো কলেজ, বন্ধুবান্ধব  আর পড়াশোনার ফাঁকে গল্পের বই পড়ার সময়ই হয়ে ওঠে না তার। ঘড়ির দিকে তাকালো ঝিলিক। দশটা বাজে। মৌ আর সৃজার ফেরার সময় হয়ে এলো প্রায়। আজ বিকেলে তিন বন্ধু ঘুরতে বেরোবে প্ল্যান করেছে। কিন্তু কোথায় যাওয়া হবে এখনো যে কিছুই ঠিক হলো না! 

 

হটাৎ কলিং বেলের আওয়াজ হলো। দৌড়ে গিয়ে দরজাটা খুলে দিলো ঝিলিক। সৃজা ও মৌ একসাথে বলে উঠলো “ঝিলিক, একটা খবর আছে !”  তাদের বলার ভঙ্গি দেখে ঝিলিকের অনেকটা জেম্স বন্ড সিনেমার স্পাইদের কথা মনে পরে গেল।

 

“কি খবর? বল বল !” আর কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে নিচু গলায় বললো ঝিলিক।

 

“প্যান্টালুনসে আজ  ফ্ল্যাট ৫০% ছাড় দিচ্ছে ! যে কোনো জিনিসে !” প্রচন্ড উৎসাহের সাথে বলে উঠলো সৃজা। 

 

খবরটা শুনে ঝিলিকের মনটা খারাপ হয়ে গেল, “ধুস, আমি ভাবলাম কি না কি খবর দিবি !”

 

“তুই এবার ডিটেক্টিভ গল্প পড়াটা কমা তো। তুই কি ভেবেছিলি ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের গোপন তথ্য নিয়ে ফিরেছি? ” মৌ বলে উঠলো হাসতে হাসতে। 

 

“আমরা আজ বিকেলে শপিং এই যাবো, বুঝলি ঝিলিক?” সৃজার এই অতি-উৎসাহের কারণ অবশ্য ঝিলিকের জানা । সদ্য এক পাতানো দাদার হাতে রাখি পরিয়ে বেশ কিছু টাকা উপার্জন হয়েছে তার। সেটা খরচ না করা পর্যন্ত শান্তি হচ্ছে না সৃজার !

 

“ঠিক হ্যায়, তাই চল।” চিন্তিত মুখে বললো ঝিলিক। হাতে কিছু টাকা থাকা সত্ত্বেও আদতে কিপটে মেয়েটার শপিং এর নাম শুনলেই বুক ধড়াস করে ওঠে। মনে মনে ঠিক করলো, বেশি টাকা সঙ্গে নেবে না, পাছে লোভ সামলাতে না পেরে কিছু কিনে ফেলে!

 

বিকেলে তিন জন বান্ধবী সেজেগুজে বেরোলো গড়িয়াহাটের দিকে। মৌয়ের খুব মাথা গরম, ঘামে তার সাজ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ! খিটখিট করতে করতে যাচ্ছে সে। ঝিলিক মনে মনে টাকার হিসাব করতে করতে যাচ্ছে। অঙ্কে নিতান্ত কাঁচা মেয়েটি অবশ্য ডিসকাউন্ট হিসাব করার সময় আর্যভট্টে পরিণত হয়। সৃজার একমাত্র যেন বাঁধ ভাঙা উচ্ছাস। কি কি কিনবে তার ফিরিস্তি দিতে দিতে যাচ্ছে সে তার দুই বন্ধুকে। 

 

একে রবিবার, তার উপর সেল, প্যান্টালুনসে পৌঁছে দেখা গেল পা রাখার পর্যন্ত জায়গায় নেই। এ যেন রথের মেলার ভীড়। কিন্তু এই নাছরবান্দা তিন কন্যে পিছপা হতে শেখেনি কোনোদিন। “মাভৈ” বলে ভীড় ঠেলে ঢোকার প্রচেষ্টায় মনোনিবেশ করলো তারা। এসি দোকানটিতে প্রবেশ করার পর মৌয়ের মাথাটা যেন কিছুটা হলেও শীতল হলো। ততক্ষনে অবশ্য তার টেম্পোরারি স্ট্রেইটেন করা চুলের বারোটা বেজে গেছে। আরেকচোট রাগারাগির ভয়ে সেদিকে আর আলোকপাত করলো না সৃজা আর ঝিলিক।  পাছে আবার রণচন্ডী মূর্তি ধারণ করে মৌ। ভীড় ঠেলে মেয়েদের সেকশন এ যতক্ষনে এসে পৌছালো তারা, মনে হলো যেন মহাভারতের যুদ্ধ জয় করেছে । ভীড়ের মধ্যে মারামারি করে যে যার মতো জামাকাপড় দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো তিনবন্ধু । 

 

১০০০ টাকায় ৪ খানা টি-শার্ট পাওয়া যাচ্ছে দেখে ঐদিকে দৌড়ালো ঝিলিক। যাক, এতে অনেকদিনের ব্যবস্থা হয়ে গেল, আবার সাশ্রয়ও হলো।  ট্রায়াল রুমের দিক থেকে শুনতে পেলো মৌয়ের আওয়াজ , “কেন, ৫টা জামা কেনার বেলায় তো না করেন না, তাহলে ৫টা জামা নিয়ে ট্রায়াল রুমে ঢুকলে কি দোষ, জানতে পারি? “

 

ট্রায়াল রুমের সামনের মেয়েটি আমতা আমতা করে কি উত্তর দিচ্ছিলো কানে এলোনা ঝিলিকের। জামা ট্রায়াল দেয়াটাই তার কাছে একটা বিভীষিকা, সে ৩তে হোক কি ৫টা। সৃজা কে দেখা যাচ্ছে না কেন কোথাও? খোঁজাখুঁজি করতে বেরোলে সে। মিনিট ১৫ পরে ক্যাশ কাউন্টারের দিকে যখন পা বাড়ালো মৌ আর ঝিলিক তখনও সৃজা বেপাত্তা । ফোন ও ধরছে না। ক্যাশ কাউন্টারে পৌঁছে দেখলো বিশাল ভীড়, মনে হল যেন সারা কলকাতা এতদিন নির্বস্ত্র ছিল, আজই সবার একসাথে জামার দরকার পড়েছে!

 

জনসমুদ্রের মাঝে হটাৎ দেখা গেল লাইনে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক বিশালাকায় সোনালী রঙের টেডি বেয়ার।  “বিচিত্র সব শখ লোকজনের” মনে মনে ভাবলো ঝিলিক। 

 

“রিডিকুলাস, সৃজা গেল টা কোথায়?” ভীড় ও ট্রায়ালের ধকলের পর পাখির বাসায় পরিণত চুল সামলাতে সামলাতে বলে উঠলো মৌ। 

 

“এই তো আমি ” টেডি বেয়ার বলে উঠলো সৃজার কণ্ঠে। প্রায় ৫ ফুট লম্বা পুতুলটির পিছন থেকে উঁকি মারতে দেখা গেল সৃজাকে। 

 

“কি সস্তায় পেলাম রে। পাক্কা ৬০% অফ।”

 

একি কান্ড ! চক্ষু ছানাবড়া  দুজনের।  সৃজা এসেছিলো তো কটা জামা কিনতে, টেডি বেয়ার কোথায় পেলো ? কিন্তু সৃজার চোখে মুখে আনন্দের উচ্ছাস দেখে আর কিছু বললো না মৌ আর ঝিলিক। 

 

“আমার কতদিনের শখ আজ পূর্ণ হবে !” আবেগ প্রবন হয়ে বলে উঠলো সে। 

 

আধ ঘন্টা যুদ্ধের পর বিধ্বস্ত অবস্তায় দোকান থেকে বেরোলো মৌ আর ঝিলিক। পিছন পিছন, অনেকটা শিবঠাকুর যেভাবে পার্বতী কে কাঁধে তুলেছিলেন, সে ভাবে পুতুলটিকে নিয়ে হাপাতে হাপাতে  বেরোল সৃজা।

 

“সি সি ডি যাবি? আই নিড এ কাপ অফ কফি?” মৌ বলে উঠলো।

 

“হ্যাঁ, চল চল। খুব ক্ষিদে ও পেয়েছে। ” সায় দিলো টেডি বেয়ার আবৃত সৃজা।

 

প্রমাদ গুনলো ঝিলিক। আবার কত টাকার ধাক্কা কে জানে ।

 

“বাইরে চা খেলে হয় না?” ভয় ভয় জিজ্ঞাসা করলো সে।  

 

“প্রশ্নই উঠছে না ” বলে গটগট করে হাটা দিলো মৌ সি সি ডির উদ্ধেশ্যে।

 

কিছুটা বগলদাবা করে, কিছুটা ছ্যাঁচড়াতে ছ্যাঁচড়াতে, পাঁজা কোলা করে পুতুল নিয়ে পিছু নিল সৃজা সি সি ডির দিকে। কিন্তু সেখানে পৌঁছে আরেক ধাক্কা!

 

“সরি ম্যাডাম,  ভীড়ে অত বড় সফ্ট টয় নিয়ে ঢুকলে অন্য কাস্টমারদের অসুবিধে হবে!” কাচুমাচু মুখ করে বললো সি সি ডির বাইরে বসে থাকা নীল জামা পড়া গার্ডটি। যাক, ঝিলিকের প্রার্থনা ভগবান শুনেছে তাহলে। আনন্দে মনে মনে একটা পেন্নাম ঠুকলো সে। অন্তত ১০০ টাকা তো বাচঁলই !

 

অগত্যা কি করা, রাস্তার ধারে  ১০টাকার চা খেয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়ালো সবাই। বাড়িটি অবশ্য হাটা পথ। কিন্তু কিছুটা যেতেই পিছন থেকে শোনা গেল সৃজার চেঁচামেচি “একটু হেল্প কর না আমাকে!” । 

“কেনার সময় মনে ছিল না?” বিরক্ত ভাবে ধমক দিয়ে উঠলো মৌ। 

 

দশ মিনিট পর যখন নিজেদের বাড়ির গেটের সামনে পৌছালো তারা তখন পুতুলটির মাথা সৃজার কাঁধে, কোমর মৌয়ের কাঁধে আর পা দুটি ঝিলিকের কাঁধে। এই বিরল দৃশ্য দেখতে অবশ্য রাস্তার অনেকেই দাঁড়িয়ে পড়েছিল। “পরের দিনের কাগজে ছবি বেরোলে খুব অবাক হবো না” মনে মনে ভাবলো ঝিলিক।

 

ঘরে ঢুকে সৃজার বেড এ পুতুল ফেলে হাপাতে হাপাতে যে যার  ঘরে পালালো ঝিলিক আর মৌ। সৃজার উচ্ছাস অবশ্য এক বিন্দুও কমে নি। হাত ধরে পাপিয়া দেবীকে টেনে নিয়ে আসলো তার  “গোল্ডি” কে  দেখানোর জন্যে । হ্যাঁ, রাস্তায় পুতুল বয়ে আনতে  আনতে এই নামটাই স্থির করে ফেলেছিল সে। 

 

“হায় ভগবান! এটা কি কিনে আনলি তুই?” পাপিয়া দেবীর হাহুতাশে গাল ফুললো সৃজার। 

 

“উফ কাকিমা, তুমি কিছু বোঝো না। কত কমে পেলাম বল তো! আর আমার কত ছোটবেলার শখ একটা বড় টেডি কেনার। এটাকে আমি জড়িয়ে ধরে ঘুমাবো রোজ রাতে ” 

 

বেচারির আনন্দ দেখে আর কথা বাড়ালেন না পাপিয়া দেবী। “আচ্ছা, খেতে চলে আয়ে সবাই এবার। ডিনার রেডি। “

 

ডিনারের পর শুরু হলো সৃজার ফোন পর্ব। জনে জনে ফোন করে পুতুলটির আয়তন, দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং দামের ফিরিস্তি দিতে শুরু করলে সৃজা। হোয়াটস্যাপ এ ছবি চলে গেল কন্যাকুমারী থেকে কাশ্মীর অবধি সবার কাছে।  ফেসবুকে লেগে গেল স্টেটাস “ফিলিং এক্সসাইটেড। ” 

 

বিছানার উপর টানটান করে শুয়িয়ে দিলো সে গোল্ডিকে। “আজ যা ভালো ঘুম হবে না রে…দেখিস। ” চেঁচিয়ে বললো মৌ আর ঝিলিককে।  কেউ বিশেষ সারা দিলো না আর। পুতুলটিকে জড়িয়ে ধরে ঘুম দিলো সৃজা। ঠোঁটের কোনায় লেগে থাকলো একটা তৃপ্তির হাসি।

 

রাত বাড়তে লাগলো, সাথে বাড়তে লাগলো অস্বস্থি।  ছোট সিঙ্গেল বেড, তার উপর গোল্ডি, তার উপর সৃজা। ঘাড়ে ব্যাথা বাড়তে লাগলো ক্রমশ। মাঝে রাতে উঠে কাতর কণ্ঠে ডেকে উঠলো সৃজা “ঝিলিক, মৌ, তোরা কি কেউ পুতুলটাকে নিয়ে শুতে চাস রে?”

 

আতঙ্কিত ঝিলিক আর মৌ টু শব্দটুকু করলো না। অনেক রাতে একটা ধপাস শব্ধে ঘুম ভাঙলো  ঝিলিক আর মৌয়ের । দৌড়ে গিয়ে সৃজার ঘরে ঢুকে দেখলো ঠোঁট উল্টে মাটিতে বসে রয়েছে সৃজা, বিছানায় আরাম করে হাত পা ছড়িয়ে ঘুমোচ্ছে গোল্ডি । 

 

“এবাবা! পরে গেলি?” খিল খিল করে হেসে উঠলো মৌ। হাসিতে ফেটে পড়লো ঝিলিক ও।  রাগে গজগজ করতে করতে বিছানার উঠে এক লাথি মেরে আদরের গোল্ডিকে ধরাশায়ী করলো তার মা। হায়রে ছেলেবেলার শখ!  এত অল্পেই যে শখপূরণের এই পরিণতি হবে কেউ ভাবতে পারেনি। গোল্ডি নির্বিকার চিত্তে বাকি রাতটা মাটিতে শুয়েই কাটিয়ে দিলো। তার মা বা মাসিরা কেউই যেন আর তার দায়িত্ব নিতে চাইলো না। 

 

পরের দিন সারাটা দিন পুতুলটি পরে রইলো মাটিতে । ছোট্ট ঘরে সৃজার চলাফেরা করা, বই রাখা, কাজের মাসির ঘর মোছা দায়ে হয়ে উঠলো । এমনকি বিরক্ত হয়ে সৃজার ঘরে আসা বন্ধ করলো দুই বন্ধু ও। আগামী দিন সকালে যখন ঘুম ভাঙলো ঝিলিকের, শোনা গেল সৃজা তার মা কে ফোন করে বলছে আর এক মুহূর্ত সে এই পুতুলটিকে ঘরে দেখতে চায়না। তারা যেন এসে গোল্ডি কে বাড়ি নিয়ে যায়। নিরুপায়, ব্যতিব্যস্ত বাবা-মা সেইদিন সন্ধ্যায় সুদূর উত্তরপাড়া থেকে গাড়ি ভাড়া করে এলেন, মেয়েকে পুতুল বিভ্রাট থেকে রক্ষা করতে। 

 

বিরক্ত বাবা মা আর এক কালের আদরের গোল্ডি কে বিদায় জানিয়ে বিছানায় এসে বসলো  সৃজা। 

 

“শখ মিটেছে?” হাসতে হাসতে জিজ্ঞাসা করলো ঝিলিক।

 

“জীবনে আর যাই করিস না কেন, ঘুমের সাথে কম্প্রোমাইস করবি না কখনো। বুঝলি ? এবার লাইট  টা অফ করে দিয়ে শুতে যা !” 

 

গম্ভীর ভাবে মৌ আর ঝিলিককে “মেসেজে অফ দা ডে” টা শুনিয়ে টান টান হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো সৃজা….এক গভীর, অবিঘ্নিত এবং  আরাম-দায়ক ঘুমের প্রত্যাশায়!

 
 
(Image source : Internet)
Posted in Bengali, short shory

ব্যতিক্রমী

মুম্বাইয়ের ছত্রপতি শিবাজী ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের ভীড় ঠেলে প্রিপেইড ট্যাক্সির লাইনে এসে দাঁড়ালো গুঞ্জা। এক হাতে একটা ছোট্ট ট্রলি, অন্য হাতে একটা বিশাল হ্যান্ডব্যাগ।পরনে একটা ডেনিমের শর্টস আর সাদা শার্ট-   ছোট থেকেই পোশাক-আশাক, হাব-ভাব সবেতেই যেন একটা স্বেচ্ছাচারিতা প্রকাশ পায় তার। মোবাইলে সময় দেখে নিলো সে। ফ্লাইট লেট করেছে দু’ঘন্টা। হাতে তার সময় বড়ই অল্প। ঠিক দু’ঘন্টা পরে একটা ইন্টারভিউ আছে তার ।  এই বছরের সর্বাধিক বিক্রিত উপন্যাস “ব্যতিক্রমী”র লেখক এর সাথে। উপন্যাসটি প্রথমে লেখা হয় বাংলাতেই। কিন্তু পরবর্তীতে ইংরেজি সহ বিভিন্ন ভাষায় তার অনুবাদ করা হয়। শোনা যাচ্ছে কোনো বিশাল চলচ্চিত্র নির্মাতা নাকি এটার উপর একটা সিনেমাও বানাচ্ছেন । এই খবর কানে আসা মাত্র তার ম্যাগাজিনের এডিটর তাকে মুম্বাই যাওয়ার আদেশ দিয়েছেন, ভদ্রলোকের ইন্টারভিউ নাকি চাই-ই-চাই। সচরাচর ইন্টারভিউ দেন না উনি। আজ পর্যন্ত বহু বড় বড় পত্রিকা বহু চেষ্টা করেও  উনার সাথে যোগাযোগ করতে পারেনি। গুঞ্জা বহু কষ্টে তার মোবাইল নম্বর জোগাড় করে একটা মেসেজ করে। কোনো অজানা কারণে গুঞ্জাকে উনি হটাৎ ইন্টারভিউ দিতে রাজি হলেন ! ব্যাস, পরের দিনের প্রথম ফ্লাইট ধরেই গুঞ্জা এখন মুম্বাইয়ে।

 

দেশের এক প্রথম শ্রেণীর লাইফস্টাইল ম্যাগাজিনে কাজ করে গুঞ্জা। কি করে যে সাংবাদিক হতে গিয়ে এই পেজ থ্রীর জগতে এসে পড়লো সে, তা তার নিজেরই  বোধগম্য হয়না। এই ঝা চকচকে জগতের কিছুই তার খুব একটা ভালো লাগেনা। যেমন এই বইটি। একটি ব্যতিক্রমী, দুঃসাহসী মেয়েকে নিয়ে নাকি লেখা একটি হালকা উপন্যাস । গল্পটি পরে দেখার প্রয়োজন অনুভব করেনি সে। ঐতো গতানুগতিক একটি প্রেমের গল্প হবে। কি করে যে তা দেশ মাতাতে পারে তা সে বুঝে উঠতেই পারেনি । এসব গল্প তার ভালো লাগেনা। সে পছন্দ করে নন-ফিক্শন এবং জীবনী পড়তে। প্রেমের গল্প পরে সময় নষ্ট করার ইচ্ছে তার নেই। কিন্তু সে শুনেছে এই লেখক ভদ্রলোক নাকি খুব কড়া মেজাজের মানুষ। বয়েস অল্পই, কিন্তু হাবভাবে নাকি একটা ঔদ্ধত্ব আছে যেটা অনেকেরই ভালো লাগেনি। তার উপর আজ হবে দেরি! এখনো ট্যাক্সিই পেলো না, তার পর হোটেলে গিয়ে চেঞ্জ করে কখন যে ইন্টারভিউতে  পৌঁছাতে পারবে ঠিক নেই । কপালে যে কি আছে কে জানে ! একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো গুঞ্জা।

 

ঘন্টা দুয়েক পরে তার হোটেল থেকে একটা ট্যাক্সিতে সে যখন ছুটে চলেছে মেরিন ড্রাইভ ধরে তাজ মুম্বাইয়ের  উদ্দেশ্যে, পাশে প্রসারিত বিশাল আরব সাগরের কলরব তার কান অবধি যেন পৌঁছালোই না। সমুদ্র পাগল সেই ছোটবেলার গুঞ্জা এখন হারিয়ে গেছে বহুযুগ। পাশেরবাড়ির ঋজুদার পরিবারের  সাথে যখন সেই ছোটবেলায় সপরিবারে প্রথম দীঘা ঘুরতে গিয়েছিল সে, কি অবাক উৎসাহ অনুভব করেছিল সেই বিপুল জলরাশি দেখে। এই বয়েসে এসে অবশ্য সেইসব তার স্মৃতি থেকে  বিলীন হয়ে যেতে বসেছে। সমুদ্রর শোভা উপভোগ করার অবকাশ এখন তার নেই। প্রাত্যহিক জীবনের ঘোড়দৌড়ে হারিয়ে গেছে সেই উচ্ছাস, সেই পুরোনো বাড়ির দালান আর সেই ঋজুদা। সপরিবারে এখন দীর্ঘ দশ বছর বাবার চাকরি সূত্রে তারা কলকাতা ছাড়া । গুঞ্জা অবশ্য একাই  থাকে দিল্লীতে, নিজের কাজের জন্যে। ট্যাক্সি নিয়ে ছুটে চলা এই নতুন গুঞ্জা এখন কেবল একটাই প্রার্থনা করছে, লেখক যেন নিজে একটু দেরি করে পৌঁছায়!  

তাজ হোটেলের  রিসেপশনে পৌঁছে খোঁজ করতে জানতে পারলো যে শ্রী অপূর্ব রায় এক ঘন্টা ধরে লাউঞ্জে তার অপেক্ষায় বসে আছেন। হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেল গুঞ্জার।  চকচকে ফ্লোরের উপর হাই হীলের শব্ধ উপেক্ষা করে সে ছুটলো লাউঞ্জের দিকে। হাতে ম্যাগাজিন ও সামনে এক কাপ গরম কফি নিয়ে সোফায় অন্যমনস্ক হয়ে বসে রয়েছেন এক ভদ্রলোক। ইনি লেখক অপূর্ব রায়। বয়েস তিরিশের ঘরে। পরনে একটা জিন্স ও সাদা শার্ট। হাতে দামী একটি ঘড়ি ব্যাতিত সাজের বিশেষ আড়ম্বর নেই, কিন্তু তবুও যেন রয়েছে  এক দারুন ব্যক্তিত্বের ছাপ।

 

কাছে এগিয়ে গিয়ে বিনীত ভাবে বললো গুঞ্জা, ” সরি মিঃ রায়, আপনাকে বোধহয় অনেকক্ষন অপেক্ষা করতে হলো।  আসলে আমার ফ্লাইটটা —“

 

তার কথা মাঝপথে থামিয়েই গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন অপূর্ব, “আপনাদের মতো এত বড় ম্যাগাজিনের কাছে আরেকটু বেশি প্রফেশনালিজম আশা করেছিলাম। যাক, বসুন।”

 

থতমত খেয়ে সামনের সোফায় বসলো গুঞ্জা। ব্যাগ থেকে নোটস বের করতে যাবে তখনি বলে উঠলেন অপুর্ব “আপনার জন্যে চা – কফি কিছু আনাবো?”

 

“না, ঠিক আছে।থ্যাংক ইউ !” উত্তর দিলো গুঞ্জা। মুখোমুখি বসে এক ঝলক ভালো করে দেখে নিলো ভদ্রলোকটিকে। একটি বুকলঞ্চে তার ছবি আগে সে দেখেছিল। কিন্তু ছবির তুলনায় সামনে অনেক বেশি হ্যান্ডসম  মনে হলো তাকে। খুব পরিচিত লাগলো চোখ দুটি। কিন্তু বহু কষ্ট করেও মনে করতে পারলো না কোথায় দেখেছে এই চোখদুটি আগে। হয়তো ছবিতেই।  ইনি তো এখন প্রায় সেলিব্রিটি, পরিচিত লাগাটা খুব একটা আশ্চর্যের  নয়!

 

ওয়েটারকে ডেকে গুঞ্জার জন্যে একটা কফি অর্ডার করে দিলেন তিনি।  গুঞ্জার একটু রাগই হলো, সে তো কফি খেতে চায়নি। কথা না বাড়িয়ে  তার প্রথম প্রশ্ন করে বসলো গুঞ্জা।

 

— “আপনি কি আশা করেছিলেন এত নাম করবে আপনার প্রথম বইটি ?”

কফি কাপ নামিয়ে অল্প হেসে উত্তর দিলেন লেখক – “আপনি বুঝি সেই সব মানুষের মধ্যে একজন যারা কাজ করেন কিছু পাওয়ার আশায় ? আমি একটু আলাদা, আমি লিখেছি কারণ লেখাটা আমার প্যাশন। ব্যাস, প্রতিদানে কিছু পাওয়ার আশা আমি করিনি ” 

 

গুঞ্জা মনে মনে রেগে উঠলো। এভাবে তাকে  আঘাত করে উত্তর দেওয়ার কি আছে? কতটুকু চেনেন তিনি ওকে? রাগ হজম করে এগিয়ে গেল নিজের দ্বিতীয় প্রশ্নের দিকে।

 

—“আপনার পারিবারিক জীবন সম্বন্ধে বিশেষ কিছুই জানা নেই, সেই সম্বন্ধে একটু বলবেন।”

“আমার কাজের সূত্রেই যখন আমার পরিচয়, তখন পরিবারের সম্বন্ধে  জেনে কি করবেন বলুন তো ?”

 

গুঞ্জা মনে মনে প্রমাদ গুনলো। এই ইন্টারভিউ সে কি করে ছাপবে ম্যাগাজিনে? কোনো প্রশ্নেরই তো উত্তর দিচ্ছেন না ভদ্রলোক।

 

— “গল্পটির পিছনে ইনস্পিরেশন কে? হটাৎ এমন ব্যতিক্রমী একজন মেয়েকে নায়িকা করলেন কেন ?”

এক মিনিট ভালো করে অপলক দৃষ্টিতে তাকে দেখলো লেখক। তারপর  ব্যাকা হাসি হেসে উঠে দাঁড়ালেন “গল্পটা পরে এলে এই প্রশ্নটা করতেন না।  আপনি বরং একটু হোমওয়ার্ক করে আসুন।  When you are ready, we will meet again!”

 

মাথা নিচু করে রইলো গুঞ্জা। মার্বেল পাথরের টেবিলের উপর একটা বই রেখে, পিছনে না ফিরে, গটগট করে হেটে বেরিয়ে গেলেন লবির থেকে লেখক । রাগে, অপমানে গুঞ্জার চোখে জল চলে এলো; এত বছরের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞত্যায় কোনোদিন এমন হয়নি তার সাথে।ব্যাগ গুছিয়ে সে যখন কোনোদিক না তাকিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে হোটেল থেকে, রিসেপশনের মেয়েটি তার পিছন পিছন ছুটে এলো বইটি হাতে নিয়ে।  “ম্যাম , এটা ফেলে যাচ্ছিলেন আপনি।”

 

অপ্রস্তুত ভাবে বইটি ব্যাগে ভোরে ট্যাক্সির ধরে নিজের হোটেলের উদ্ধেশ্যে রওনা দিলো সে।মনে একটাই চিন্তা রয়ে গেল, “কি উত্তর দেবে সে তার বসকে?” ঝাপসা চোখে চেয়ে রইলো বিসতৃত আরব সাগরটির দিকে। 

 

*****

 

রাতে বসের এক ঘণ্টা বকাবকি খেয়ে আর বিশেষ ক্ষিদে বাকি রইলো না গুঞ্জার।  শ্রী অপূর্ব রায়ের ইন্টারভিউ না নিয়ে দিল্লী ফিরলে তার চাকরি যে আর রইবে না, সেটা তার বস পরিস্কার বুঝিয়ে দিয়েছেন। বইটা ব্যাগ থেকে বের করে বিছানার পাশের টেবিল ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে বসলো গুঞ্জা। দোষটা তারই।  হোমওয়ার্ক করে আবার যোগাযোগ করতে হবে লেখকের সাথে। আর কোনো উপায় নেই। 

ভোর রাতে যখন বইটির শেষ পাতায় পৌছালো সেই, আশ্চর্য রকমের একটা অনুভূতি হতে লাগলো তার। সত্যি যেন একটি ব্যতিক্রমী গল্প এটি।  না, কোনো হালকা প্রেমের গল্প তো নয়, এই গল্প এক সজীব, প্রাণবন্ত মেয়ে “ত্রিধা”কে নিয়ে,  যে একটা স্বপ্ন দেখেছিল, দেশের সর্ব সেরা ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট হওয়ায়। তার স্বপ্নপূরণের গল্প এটি।  গল্পের পাতায় পাতায় যেন নিজেকে খুঁজে পেলো সে। সেই তো ত্রিধা! কিন্তু এই গল্প যে তার একার নয়, এ গল্প যেন দেশের প্রতিটি মেয়েকে নিয়ে লেখা যারা গতানুগতিক জীবনের কাছে একটু বেশি কিছু চেয়েছে – একটু এডভেঞ্চার, একটু উচ্ছাস ! যারা সমাজের চিরাচরিত চিন্তাধারার বাইরে গিয়ে চিন্তা করতে শিখেছে, যারা মাথা না নুইয়ে নিজের পরিচয় বানাতে চেয়েছে, যারা কোনোদিন মেয়ে বলে নিজেদের কারো থেকে দুর্বল ভাবেনি, এই গল্প যে তাদের সকল কে নিয়ে ! 

বইটির বন্ধ করে রাখার সময় হটাৎ শেষের পাতায় একটি নীল পেনের লেখা চোখে পড়লো তার। এত অপমান করে আবার স্বাক্ষর দিয়েছেন লেখক! হাসি পেলো গুঞ্জার।  শেষের পাতাটা  উল্টে দেখলো গুঞ্জা। পরিষ্কার হাতের লেখায় লেখা : 

 “ভালো লাগলে জানাস। তোর ফোনের অপেক্ষায় রইলাম। – ঋজুদা”

বুকটা ধড়াস করে উঠলো তার…. ঋজুদা ! অপূর্ব রায় কি তাহলে তার ছদ্মনাম ? সেই চোখদুটো…হঠাৎ তাকে ইন্টারভিউ দিতে রাজি হওয়া…..সেই পরিবার নিয়ে রাখঢাক….এবং গল্পের অনুপ্রেরণা জানতে চাওয়ায় তার প্রতিক্রিয়া….সব যেন ধীরে ধীরে পরিস্কার হতে লাগলো তার কাছে! মনে পড়লো সেই দিনগুলো যখন ঋজুদার বাড়িতে প্রথম এসেছিলো কেবেল টিভি। হাঁ করে দেখতো ওরা  দুজন সেই দুঃসাহসী সাংবাদিক মেয়েটিকে, যে ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের “Live reporting” করছিলো সুদূর বর্ডার থেকে। কি অসামান্য সাহস, কি মনের  বল! গুঞ্জা তো সেই স্বপ্নই দেখেছিল! আর সেই স্বপ্নের ভাগিদার এবং উৎসাহদাতা  ছিল ঋজুদা। তারপর কোথায় হারিয়ে গেল সেই পুরোনো বাড়ি আর পুরোনো সম্পর্কগুলো !

মা বাবার মন রাখতে ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টের বদলে আজ পেজ ত্রি রিপোর্টিং করে গুঞ্জা। চিরাচরিত জীবনের আরাম ও নিরাপত্তার সাথে আপোষ করে নিয়েছিল তার মতো একটি মেয়েও। কিন্তু ঋজুদার চোখে যে এখনো তার স্বপ্নগুলো সজাগ। তার কলমের টানের মধ্যে দিয়ে যেন সেই পুরোনো নিজেকে খুঁজে পেয়েছে সে! 

ঘরের কোনে পরে থাকা মোবাইল ফোনটা তুলে শ্রী অপূর্ব রায়ের নম্বর ডায়াল করলো গুঞ্জা। ভোর রাতে কোনো সেলিব্রিটিকে অকারণে ফোন করে বিব্রত করা তার জার্নালিস্ট এথিক্সের বাইরে। কিন্তু অপেক্ষা করতে মন চাইলো না তার! কথা যে তাকে বলতেই হবে! এই ভোর রাতে নিজে ঘুমোতে যাওয়ার আগে নিজের সুপ্ত স্বপ্নগুলোকে জাগিয়ে তোলাটা যে অনেক বেশি দরকার মনে হলো গুঞ্জার !

Posted in Bengali, short shory

আমি শ্রীজিতা

কলকাতার এক বিশিষ্ট মহিলা কলেজের প্রেক্ষাগৃহ।  শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত এই বিশাল কক্ষটিতে আজ জমায়েত হয়েছে কলেজের সব ছাত্রী। মাইক  হাতে কলেজের অধক্ষ্যা ছাত্রীদের উদ্দেশ্য করে বলছেন-

“আজ আমাদের বিশেষ অতিথি এই কলেজের প্রাক্তন ছাত্রী এবং প্রখ্যাত অভিনেত্রী ও পরিচালিকা শ্রীজিতা মিত্র। তার পরিচালিত সর্বশেষ চলচ্চিত্রটি দেশের এবং বিদেশের নানান সমালোচকদের দ্বারা খুব প্রশংসিত হয়েছে এবং সম্মানিত কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে তার স্ক্রীনিংও হয়েছে। শ্রীজিতার এই সাফল্যে গর্বিত আমরা সকলেই। তাই আজ কলেজের বার্ষিক অনুষ্ঠানে তাকে বিশেষ ভাবে অনুরোধ করা হয়েছে ছাত্রীদের কিছু বলে অনুপ্রেণীত করার জন্যে। আমি এবার মঞ্চে ডেকে নিতে চাই আমাদের সকলের প্রিয় শ্রীজিতা মিত্রকে। “

করতালিতে ফেটে পড়লো সভাঘরটি। বিনীত ভাবে জোড়হাতে স্টেজ উঠে এলেন এক অপুরূপ সুন্দরী মধ্যবয়স্কা মহিলা। পরনে একটি সাদা খোলের উপর কাঁথা স্টিচের রুচিসম্পন্ন শাড়ি ও খোঁপায় দুটি সাদা গোলাপফুল ছাড়া আর কোনো সাজের আতিশয্য নেই।  কেউ ভাবতেই পারবে না ইনি এত বড় একজন অভিনেত্রী। মাইক  হাতে তুলে গলা পরিস্কার করে শুরু করলেন তার বক্তব্য–

“নমস্কার।  আমি শ্রীজিতা।  আমার কাজের সাথে হয়তো আপনারা অনেকেই পরিচিত। তাই সেইসব নিয়ে আজ আর কথা বলবো না।  কিন্তু এই কলেজের ছাত্রীরা যারা আজ জমায়েত হয়েছে আমার কথা শুনতে, তাদের আজকে আমি শোনাবো একটি গল্প। আমার জীবনের গল্প। প্রায় বছর কুড়ি আগে আমিও ছিলাম তোমাদেরই মধ্যে একজন। এই প্রেক্ষাগৃহে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে শুনতাম কত বিশিষ্ট প্রাক্তন ছাত্রীদের ভাষণ। দুচোখে ছিল কত স্বপ্ন, কত ইচ্ছে। ঠিক তোমাদেরই মতন।

ছোটথেকেই অভিনয়ের শখ ছিল।  স্কুল কলেজে অনেক নাটকে অভিনয় করেছি। তারপর সুযোগ পেলাম একটি নামী দলের সাথে স্টেজে নাটক করার। সেই থেকে টেলিভিশনে সিরিয়াল করার সুযোগ পেলাম। নায়িকার ভূমিকা। সেইসব এখন স্বপ্নের মতো মনে হয়।  তখন আমার প্রচুর অনুরাগী। রাস্তায় বেরোলেই লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো সবাই একটি অটোগ্রাফের জন্যে।  শুটিং, পার্টিস, বিদেশ সফর, তারপর কিছু সিনেমায় পার্ট করার সুযোগ….আমি যেন একটি স্বপ্নপুরীতে বাস করছিলাম।

কিন্তু বুঝতে পারিনি যে এই “সেলুলয়েডের ” জগৎটা  কত ঠুনকো, কত সংকীর্ণ। হটাৎ লক্ষ্য করলাম আমার ধীরে ধীরে একটু একটু করে ওজন বাড়তে শুরু করলো। প্রথমে ভাবলাম খাওয়া দাওয়ার অনিয়ম।  খাওয়া নিয়ন্ত্রণ করলাম, ব্যামের সময় বাড়ালাম, রোজ সাঁতার কাটা শুরু করলাম। তার পরও লক্ষ্য করলাম কিছুতেই নিজের ওজন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছি না।  এদিকে আমার ডিরেক্টর/প্রোডিউসারদের মাথায় হাত।  নায়িকা মোটা হলে নাকি সিনেমা চলবে না। কিছুটা বাধ্য হয়েই ডাক্তার দেখলাম। জানতে পারলাম আমার hypothyroidism আছে।  ডাক্তারের কথা মতো চলতে শুরু করলাম কিন্তু তাতেও বিশেষ লাভ হলো না।

ফলস্বরূপ আমাকে সিরিয়াল থেকে বাদ দিয়ে দেয়া হলো।  আস্তে আস্তে সিনেমার অফার পাওয়া বন্ধ হয়ে গেল।  আমি প্রচন্ড ভাবে বিষন্ন হয়ে পড়তে শুরু করলাম ক্রমাগত।  প্রতিটা ইন্টারভিউতে একই প্রশ্ন করা হলো আমাকে। কাগজে আমার চেহারা নিয়ে রম্য রচনা বেরোতে লাগলো। আমি চিৎকার করে সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম যে এটি একটি অসুখ। আমি অসুস্থ। হাসির খোরাক নই। কোনো লাভ হলো না। বাড়িতে ভুয়ো চিঠি আসতে লাগলো, বাংলা চলচিত্রের সবচেয়ে কুৎসিত অভিনেত্রী নাকি আমি।  যারা এতদিন আমার একটি অটোগ্রাফের জন্যে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো, তারা নিমেষে ভুলে গেল আমাকে। এক মুহূর্তে বুঝিয়ে দিলো, আমার চেহারাটাই সব ছিল,  প্রতিভার কোনো দাম নেই।

Stardom জিনিসটাই বড়ো ছলনাময়ী। আজ আছে কাল নেই। এক পলকের মধ্যে লোকে তোমায় আপন করে নিতে পারে, এক পলকে ভুলে যেতে পারে। আমার সাথেও তাই হলো।  কদিনের মধ্যে দেখলাম আমার হাতে কোনো কাজ নেই। এতগুলো বছর অভিনয়ে সমর্পন করার পর অন্য কাজ খুঁজে পাওয়া খুব শক্ত মনে হতে লাগলো। বিধবা মা, ছোট ভাইকে নিয়ে আমার জগৎ। কি করে মা কে বলি যে “মা, তোমার মেয়ে একদিন খুব বড় গলা করে বলেছিলো তোমাকে আর কাজ করতে হবে না, আমিই সব দায়িত্ব নেবো এখন থেকে। কিন্তু আজ আমি আবার বেকার। আমি যে নিজের কাছে নিজেই হেরে গেলাম মা”!

দিনের পর দিন নিজের অন্ধকার ঘরে কাটাতে শুরু করলাম। আয়নায় নিজেকে দেখলে রাগে জ্বলে পুড়ে উঠতাম। নিজেকে ঘেন্না করতে শুরু করেছিলাম। মনে হতো নিশ্চই আমারই ভুল, পুরো দুনিয়া তো আমাকেই দোষারোপ করছে। নিজের পরিবারের সামনে নিজেকে দোষী মনে হতে লাগলো। তারপর যখন দেখলাম আর পারছি না, মনে মনে ভাবলাম এই ব্যর্থ, অসফল জীবনটাকেই শেষ করে দেব।

এই সময়ই একদিন হটাৎ একটা চিঠি বাড়িতে এলো। আমার এক প্রাক্তন ফ্যান আমাকে চিঠি লিখে জিজ্ঞাসা করছে যে আমি অভিনয় করছি না কোনো আর। সে নাকি এখনো আমার ছবির অপেক্ষায় আছে।  প্রথমটা খুব হাসি পেলো। তারপর মনে হলো এই একটি মেয়ে অন্তত আমার চেহারা ছাপিয়ে আমার কাজটাকে মনে রেখেছে তাহলে। ঘরে বসে ভাবতে লাগলাম। কেন আমি অন্যের চোখে নিজের কদর খোঁজার চেষ্টা করছি। কেন অন্যদের এতটা অধিকার দিয়েছি আমার ব্যক্তিগত জীবন, আমার চেহারা, আমার শরীর নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করার। যদি তারা করেও বা , কেন আমি তাদের এতটা গুরুত্ব দেব। নায়িকা সুন্দরী “size 0” হবে কেন সব সময়; চেহারার সাথে গল্প বলার,  চলচ্চিত্রের গভীরতার কি সম্পর্ক ?

আমি ঠিক করলাম আর লুকিয়ে থাকবো না। হেরে যাবো না আর। নিজের জমানো যেটুকু টাকা ছিল তা দিয়ে একটা ছোট বাজেটের সিনেমা বানাবো। তাতে থাকবে না কোনো বড় অভিনেতা, সঙ্গে যুক্ত থাকবে না কোনো বড় নাম।  যদি এখনো এই পৃথিবীতে প্রতিভার কদর থাকে তাহলে অন্তত আজকের মতো একজন অনুরাগী আমায় এসে বলবে “দিদি, খুব ভালো কাজ করেছো”!

সেই সিনেমাটি  সমগ্র বিশ্বে সম্মানিত হলো, হটাৎ একজন নামকরা পরিচালক হিসাবে আমার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লো। যে প্রোডিউসাররা আমাকে একদিন প্রত্যাখ্যান করেছিল তারা ছুটে এলো আমার দোরগোড়ায় আমার সাথে কাজ করার জন্যে। তার মাঝে কিছু “critically  acclaimed” সিনেমাতে প্রমুখ চরিত্রে  অভিনয় করার আবার সুযোগ পেলাম। আজ আমি সাফল্যের শীর্ষে। অথচ একদিন সমাজের চোখরাঙানিকে ভয় পেয়ে লুকিয়ে ছিলাম অন্ধকার ঘরে, শেষ করে ফেলতে চাইছিলাম নিজের জীবনটাকে। কত পাওয়া অসম্পূর্ণ থেকে যেত বলতো!

এই কথাগুলো এই  কারণেই তোমাদের বলছি যাতে তোমরা বুঝতে পারো যে মানুষের চেহারা ছাপিয়ে তার মধ্যেকার প্রতিভাগুলিকে কদর দেয়া অনেক বেশি জরুরি। আজকে যারা বলছে আমাকে ছাড়া বাংলা চলচিত্রের ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যেত তারাই তো একদিন ঠেলে ফেলে দিয়েছিলো আমাকে। তাই নিজের কদর তোমাদের নিজেদের করতে শিখতে হবে, নিজেকে সুস্থ রাখো কিন্তু যারা সুস্থ হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে তাদের কখনো অসম্মান করো না। আর কখনো হার মেনে নিয়োনা। মনে রাখবে রাতের শেষেই কিন্তু দিন থাকে। দিনের আলো দেখার আগেই রণে ভঙ্গ দেয়া কি উচিত?

আমি শ্রীজিতা আর এই আমার গল্প। আমার এই কথাগুলোর মধ্যে দিয়ে যদি আমি তোমাদের মধ্যে একজনকেও অনুপ্রেরণা দিয়ে থাকতে পারি, সেটাই হবে আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমার সবচেয়ে বড় পাওনা। ধন্যবাদ। “

কয়েক মুহূর্তের নিস্তব্দতাকে চীরে ফেটে পড়লো করতালি। গ্রিনরুমের দরজার আড়ালে দাড়িয়ে ফুলের তোরা নামিয়ে রেখে চোখের কোনায় জমে থাকা একবিন্দু  জল মুছে ফেললেন  শ্রীজিতা। হর্ন বাজিয়ে কলেজের গেট থেকে বেরিয়ে গেলেন তার বিদেশি গাড়ি নিয়ে, ফেলে রেখে গেলেন এক ঘর মন্ত্রমুগ্ধ শ্রোতা, জ্বালিয়ে দিয়ে গেলেন তরুণ মনে আশা ও আত্মবিশ্বাসের দীপ।

Posted in Bengali, short shory

এক মুঠো আকাশ…..

আর্যর বিয়ের আর দিন চারেক বাকি। বাবার অবর্তমানে বিয়ের সম্পূর্ণ দায়িত্ব পড়েছে তার ভাই অর্কর উপর।  প্যারিসে নিজের রিসার্চ থেকে এক মাসের ছুটি নিয়ে কলকাতা চলে এসেছে অর্ক বেশ কিছুদিন হলো। মায়ের পক্ষে একা হাতে পুরোটা সামলানো সম্ভব হচ্ছিলো না আর । যমজ ভাইয়ের বিয়ের আয়োজনে কোনো ফাঁক রাখতে চায়না সে।  ঠিক বাবা থাকলে যেরকম আয়োজন হতো , তেমনটি করার চেষ্টা করছে অর্ক । এত পরিশ্রম যাচ্ছে সারাদিন বলেই হয়তো আজ  সকালে উঠতে অনেকটা দেরি হয়ে গেল তার।  আজ মা আবার কল্যাণীতে মামাবাড়ি যাবে। ওদের কার্ড দিয়ে আজকের দিনটা ওখানে কাটিয়ে কাল ফিরবে। দুই ভাই আজ বাড়িতে একা। বিয়ের পর দুজন কি আদৌ এরকম সুযোগ আর পাবে একসাথে সময় কাটানোর ? তাই দু’ভাই  ঠিক করেছে আজ জমিয়ে আড্ডা দেবে। সারাটাদিন একসাথে কাটাবে। 

সাইড টেবিল থেকে চশমাটা  পরে ঘড়িটা দেখে নিলো অর্ক। প্রায়  ৯.৩০ টা ।  কেউ তাকে আর ডাকেনি সকালে। মায়ের বেরোনোর সময় তো হয়ে গেল প্রায়।  ফ্রেশ হয়ে নিচে নামার সময় সিঁড়ি থেকে মেঘনার গলার আওয়াজ পেলো। মেঘনা আজ এখানে? হটাৎ ? মেঘনা ওর ভাইয়ের হবু স্ত্রী। সবাই একই ক্লাসে পড়তো ওরা স্কুলে, সেই থেকে আর্য আর মেঘনার প্রেম, আজ দীর্ঘ চোদ্দ বছর পর সেই প্রেম পরিণতি পেতে চলেছে। কয়েক ধাপ সিঁড়ি দিয়ে নামতেই আরেকটা গলার আওয়াজ পেলো, খুব মিষ্টি একটা গলার আওয়াজ, খুব পরিচিত, খুব কাছের। আট বছর পর সেই আওয়াজটা শুনে হটাৎ গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো অর্কর। এই আওয়াজের সাথেই তো কত রাত্রি ফোনে গল্প করতে করতে ঘুমিয়েছে সে, কত গান গেয়েছে স্টেজে, কত ঝগড়া করেছে আর তারপর ফোনে সরি বলেছে। এই আট বছরে সে তো এই আওয়াজটাকে ভোলে নি,  কিন্তু আফসোস, আওয়াজটা যে তাকে ভুলে গিয়েছে !

 

সিঁড়ি তে সবার অলক্ষ্যে দাঁড়িয়ে নিজেকে শান্ত হওয়ার সময় দিলো সে। এতদিন পরে নিজের দুর্বলতাটা মেলে ধরতে সে রাজি নয় একেবারেই। বেশ কয়েক মিনিট নিজেকে শক্ত করে সিঁড়ি দিয়ে লিভিং রুমে প্রবেশ করলো সে। মা আর আর্যর সাথে সোফায় বসে গল্পে মশগুল রিয়া আর মেঘনা, ঠিক আগের মতো। কয়েক সেকেন্ড রিয়াকে ভালো করে দেখলো অর্ক, স্কুলে পড়া সেই টমবয়টা এখন সালোয়ার কামিজ, হাইলাইট করা লম্বা খোলা চুল আর ঝোলা কানের দুলের পিছনে হারিয়ে গেছে  কোথাও। এই মেয়েটা তার সাথে ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে সারা স্কুল জীবন মারামারি করে এসেছে ভাবতে পারবে কেউ ? মুখশ্রীটা   কি এতটাই সুন্দর ছিল না বয়েসের সাথে সৌন্দর্যটাও বেড়ে গাছে তার ? এখনও কি আগের মতো গান গায়ে সে ? চকলেট খায়? কার্টুন ভালোবাসে ? এখনো কি ডিটেক্টিভ গল্পে ডুবে থাকে?  হাজারটা প্রশ্ন  মনে একসাথে ভীড় করে এলো অর্কর। 

 

তাকে লক্ষ্য করে হটাৎ আর্য ডেকে ওঠায় এক ঝটকায়ে বাস্তবে ফিরে এলো অর্ক। এবার এক্টিং এর পালা। স্কুল  জীবনে করা যত নাটকে যেটুকু অভিনয় শিখেছে সে, এবার তা কাজে লাগানোর সময়। অল্প হেসে এগিয়ে গিয়ে হাত বাড়ালো রিয়ার দিকে। 

– হাই, অনেক দিন পর, কেমন আছিস?

– এই তো ভালো আছি, তোর খবর বল। 

হেসে উত্তর দিলো রিয়া। অর্ক বুঝলো নিজের শ্রেষ্ঠ অভিনয় করার জন্যে উঠে পরে লেগেছে রিয়াও। মনে মনে ভাবলো “চ্যালেঞ্জ একসেপ্টেড “।

 

মেঘনা বলে উঠলো পাশ থেকে – “দেখ, আট বছর পর খুঁজে বের করেছি রিয়াকে। কত কাঠ খড় পোড়াতে হয়েছে।  কিন্তু একবার যখন পেলাম পরিষ্কার জানিয়ে দিলাম, আমার সেই ছোটবেলার বেস্ট ফ্রেন্ড না এলে আমি বিয়ের পিঁড়িতে বোসবই না।  জেদ  করে নিয়ে এলাম দেখ ওকে।”

 

– “বেশ করেছিস, কেন  রে কাকীমাটার কথাও এতদিন মনে পড়লো না একবার ও ?” ; মা বললো ।

 
– “সত্যি রিয়া, কত স্মৃতি বলতো আমাদের চার জনের ! এই শহরে একসাথে বড় হলাম।  এতদিন একটা ফোন পর্যন্ত করলি না ? কেন বলতো?”
 

আর্যর  শেষ প্রশ্নটার উত্তর সবাই জানতো। অর্কর গায়ে আবার কাঁটা দিয়ে উঠলো। রিয়া অবশ্য খুব সহজ ভাবেই উত্তরটা  দিলো ;

“বাবা বোম্বে ট্রান্সফার হয়ে গেল, আমিও পুনে চলে গেলাম পড়তে। তার পর চলে গেলাম লন্ডন হাইয়ার  স্টাডিজের জন্যে । এতো ব্যস্ততার মধ্যে আর কলকাতা আসাই হলো না।  তোমাদের সবার কথা খুব মনে পড়তো।”

 

রান্নার মাসি কে রিয়া আর মেঘনার জন্যে খাবারের ব্যবস্থা করতে বলে মা রওনা হলো মামা বাড়ির দিকে। মা চলে যাওয়াতে আবার সেই চারজনের দলটা তৈরী হয়ে গেল আগের মতো। বাকি তিনজন পুরোনো দিনের স্মৃতিচারনে ব্যস্ত। রিয়া এত স্বাবাবিক, সহজ ভাবে গল্প করছে যেন আট বছরটা আট দিন মাত্র। এতটাই কি ভালো অভিনেত্রী সে না সত্যি কিছু যায় আসে না তার? এত বছরে নিশ্চই তার জীবনে কেউ এসে গেছে? তার জন্যেই নিশ্চই এখন এত সাজ, এত পরিবর্তন? হঠাৎ অভিমান, ঈর্ষায় মাথা ঝা ঝা করে উঠলো তার।  খিদে তার অনেক্ষনই উড়ে গেছে, তাও উঠে নিজের জন্যে এককাপ কফি  বানালো।  স্ট্রং কফি আর মেয়েদের দামি পারফিউমের আড়ালেও সেই পরিচিত গন্ধটা আস্তে আস্তে পুরোনো দিনে ঠেলে নিয়ে গেল তাকে, সেই ছোটবেলার স্মৃতিগুলোর কাছে যেগুলোকে অনিচ্ছাসত্ত্বেও এখনো আঁখরে ধরে বসে আছে সে। 

 

*****

 

চার বন্ধু প্রায় একসাথে বড় হয়েছিল তারা। একই স্কুল, তার পর একই কলেজ। কোনোদিন কেউ কাউকে ছেড়ে থাকতে ওরা শেখেনি। রিয়া তো ওদের সাথে মিশে নিজেকে প্ৰায়ে ছেলেই ভাবতো। ক্রিকেট খেলতো ওদের থেকেও ভালো, ক্যারাটের মারে দুই ভাইকে নাজেহাল করতো, অর্ক যখন প্রথম বাইক কিনলো, রিয়া তার আগে সেটা চালাতে শিখে ফেলেছিলো আর বাইক নিয়ে সারা কলকাতা ঘুরে বেড়াতো। তাদের কলেজ ব্যান্ডে গান গেয়ে পাড়া মাতাতো। এই সব বাইক  নিয়ে মারামারি, ফুচকায়ে লংকার পরিমাণ নিয়ে ঝগড়া ঝাটি, নতুন গান লেখার প্রচেষ্টা আর গল্পের বই আর ক্লাসনোটস আদান প্রদানের  ফাঁকে কখন যে অর্ক এই ব্যতিক্রমী মেয়েটিকে ভালোবেসে ফেলেছিলো, নিজেও বুঝতে পারেনি। একদিন কলেজের শেষে বারান্দায় বসে ফেস্টের আলোচনা করার ফাঁকে ভয় ভয় নিজের মনের কথা যখন জানায় তাকে, জীবনে প্রথম দস্যি মেয়েটার মুখে একটা লাল আভা ফুটে উঠতে  দেখেছিলো সে। গোধূলি লগ্নে ওই সলজ্জ হাসিটা আজও মনে দাগ কেটে আছে অর্কর।  

 

তার পর তিন বছর কেটেছিল স্বপ্নের মতো, রাতের পর রাত  ফোন, গল্পের বইয়ের পাতার আড়ালে চিঠি ও আনাড়ি হাতের কবিতা, কলেজের ক্লাস কেটে লুকিয়ে সিনেমা, দূর্গা পুজোর অঞ্জলীর ফাঁকে আড়চোখে একে অপরকে দেখে মুচকি হাসা, সরস্বতী পুজোয় রিয়াদের ফ্ল্যাটের বিশাল প্রতিমা রাত জেগে সাজানো, বইমেলায় পাশাপাশি বসে বেনফিশের চপ খাওয়া, রিয়ার প্রথম বানানো পাথরের মতো শক্ত কেকটাকে খেয়ে প্রশংসা করা, বার্থডে আর ভ্যালেন্টাইন্স ডে তে স্পেশাল গিফটের খোঁজে রাতকে দিন করা…..সবই এখন স্মৃতি।

 

এই স্পষ্ট বক্তা, মুক্ত মনের মেয়েটাকে অর্ক ভালোবাসতে পেরেছিলো ঠিকই, কিন্তু নিজের কাছে ধরে রাখতে পারেনি। হয়তো ধরে রাখার প্রচেষ্টাটাই ছিল তার সবচেয়ে বড় ভুল। কোথাও একটা রিয়ার স্বপ্নগুলোর মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল সে, তাই হয়তো তার থেকে দূরে রিয়ার পুনে পড়তে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা মেনে নিতে পারেনি অর্ক । আজন্মের সম্পর্কে ভাঙ্গন ধরতে শুরু করলো। দূরত্ব, অহংকার, আত্মাভিমান যেন খুঁড়ে খুঁড়ে খেতে লাগলো সম্পর্কটাকে।  একদিন ধস নামলো এবং তার গতিতে ছিটকে আলাদা হয়ে গেল রিয়া সবার থেকে। কোনোদিন পরস্পরকে খোঁজার চেষ্টাও করেনি তারা। বরং নিজেদের আরো দূরে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে নিজের দেশ, চেনা শহর, পরিচিত  মানুষগুলোর থেকেও দূরে চলে গেছে  তারা। আজ বিদেশের মাটিতে দুজনে আবার  করে গড়ে তুলেছে তাদের জগৎ – নতুন কিন্তু একটা অসম্পূর্ণ জগৎ। 

 
 *****
 

ঘন্টা দেড়েক আড্ডা দেয়ার পর মেঘনা জানালো তার এবার বাড়ি ফেরা উচিত। যোধপুর পার্ক এর পুরোনো ফ্ল্যাটটাতে রিয়া এখন এসে উঠেছে কদিনের জন্যে। কিছুটা জোর করেই আর্য অর্ককে পাঠালো গাড়িতে রিয়াকে ছেড়ে আসতে। সারা দুনিয়া ঘোরাঘুরি করা এই মেয়েটি যে ট্যাক্সি করে  দিনেরবেলা ঠিক বাড়ি পৌঁছে যাবে, সেটা জানতো অর্ক। কিন্তু যখন দেখলো রিয়াও বিশেষ প্রতিবাদ করছে না তার থেকে লিফ্ট নিতে, তখন সে রাজি হয়ে গেল। নিজের সম্পূর্ণ মনোযোগ স্টিয়ারিং হুইলের  দিকে উপনিবিষ্ট করলো অর্ক। গাড়ির মধ্যেকার দম বন্ধ করা নিস্তব্ধতা দূর করতে রেডিওটা চালিয়ে  দিলো সে। অনুপম রায়ের  সদ্য রিলিজ হওয়া একটি গান  ভেসে এলো –

   

“ফুটকড়াই, অ্যান্টেনা, হাফ চিঠি, হাফ প্যাডেল

আয়না আর জলপরীর গল্প বল

বন্ধু চল…

সাপ লুডো, চিত্রহার, লোডশেডিং, শুকতারা

পাঁচসিকের দুঃখদের গল্প বল

বন্ধু চল

বন্ধু চল… বলটা লে.

রাখবো হাত তোর কাঁধে

গল্পেরা এই ঘাসে 

তোর টিমে তোর পাশে” 

         

গানটা শুনে কিছুটা আনমনা হয়ে গিয়েছিলো অর্ক। হঠাৎ রিয়ার কথায় যেন এক যুগের নিস্তব্ধতার বাঁধ ভাঙলো।

– “তোর কি বাড়ি ফেরার তাড়া  আছে?” 

 

– “না, কেন বলতো? ” ; খুব সাবধানে জিজ্ঞাসা করলো অর্ক।

 

– “কলকাতাটা একটু ঘুরে দেখতে ইচ্ছে করছে।”

 

অল্প হেসে রিয়ার বাড়ির দিক থেকে গাড়িটা ঘুরিয়ে দিলো অর্ক।  অনেক দিন পর চেনা বন্ধুর পাশে দাঁড়িয়ে প্রিন্সেপ ঘাটের হাওয়া খেলো, সেন্ট পলসের নিস্তব্দতায় দুজন মনে মনে প্রার্থনা করলো যেন এই দিনটা শেষ না হয় কোনোদিনো,  ভিক্টোরিয়ার বাইরে গল্প করতে করতে  বিট নুন দিয়ে বাদাম ভাজা খেলো, বইপাড়া ঘুরে তাদের সেই ছোটবেলার প্রিয় লেখকদের সেকেন্ড হ্যান্ড ডিটেক্টিভ নভেল কিনলো, গড়িয়াহাটের ভীড় ঠেলে প্রচন্ড দাম দর করে রিয়া কানের দুল কিনলো এবং পড়ন্ত বিকেলে যখন প্রচন্ড খিদে পেলো, তখন পার্ক স্ট্রিটের সেই সবচেয়ে প্রিয় রেস্তোরাটার শীতল আলো আঁধারিতে গিয়ে বসলো দুজনে।  

 

চাইনিজ খেতে খেতে কথার ছলে দুজন দুজনকে জমে থাকা নানান প্রশ্ন করতে লাগলো।  শেষ পাতে যখন বিশাল আইস ক্রিমটাতে চামচ ডুবালো রিয়া, তার চোখে মুখে ফুটে ওঠা আনন্দ দেখে অর্ক বুঝলো বাইরের খোলসটার ভিতরে লুকিয়ে থাকা  মেয়েটি একফোঁটাও বদলায় নি। সাথে সাথে কোথাও একটা সেই সুপ্ত ইচ্ছেগুলো আবার মাথা চারা দিয়ে উঠতে শুরু করলো তার মনে।

দিনের শেষে যখন রিয়াকে তার বাড়ি নামিয়ে দিলো অর্ক , গাড়ি থেকে নামার আগে হটাৎ বলে উঠলো রিয়া “জানিস অর্ক,  সত্যি কথা বলতে এই দিনটার লোভেই কলকাতা ফিরলাম এতদিন পরে। ভাবতে পারিনি এতো কিছুর পর আমার এই অন্যায় আব্দারটা  তুই রাখবি। থ্যাংক ইউ।”

কি উত্তর দেবে ভেবে পায়নি অর্ক। মাথা নিচু করে একটু হেসেছিলো মাত্র । 

 

*****

 

শীতের রাতে ডিনার করে দুই ভাই এক লেপের ভিতর ঢুকে অনেক রাত অব্ধি গল্প করলো সেইদিন। আর্য আর মেঘনা যে আজ ইচ্ছে করেই রিয়াকে ওদের বাড়ি নিয়ে এসেছিলো তা বুঝতে বাকি নেই অর্কর। অনেক রাতে যখন আর্য ঘুমিয়ে পড়লো, ল্যাপটপটা খুলে এই প্রথম ফেসবুকে রিয়াকে খুঁজলো অর্ক। অনেক সাহস সঞ্চয় করে একটা মেসেজ পাঠালো – “হাই” । যখন কয়েক মিনিটের মধ্যেই উত্তরে আরেকটা “হাই” এলো, অর্ক বুঝলো রাতের ঘুম তার একার ওড়েনি। সেই রাতে বহুযুগ পর মেসেজ আদান প্রদানের মাধ্যমে কথা বলতে বলতে আবার ভোর করলো দুজন। ল্যাপটপ রেখে একটা নিবিড় ভালোলাগার অনুভূতি নিয়ে শুয়ে পড়ার আগে কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে একবার দেখে নিলো ঘুমে অচৈতন্য ভাইটার মুখটা । ছোটোখাটো কিছু অমিল কে উপেক্ষা করলে ঠিক যেন তার নিজের প্রতিচ্ছবি। তাই হয়তো ওর এতদিনের না বলা কথা, একাকীত্ব আর চেপে রাখা দীর্ঘশ্বাসগুলোকে এত সহজে বুঝে ফেলেছিল আর্য। গাড়ির থেকে নামার আগে রিয়ার বলা কথাটা আবার মনে পড়লো তার। বয়েস এবং অভিজ্ঞতার সাথে অন্তত এইটুকু বুঝেছিলো সে, আকাশের মেঘের মতো হালকা, বাতাসের মতো মুক্ত মনের এই মেয়েটিকে পেতে গেলে তাকে মুষ্টি বদ্ধ করে রাখার প্রচেষ্টা বৃথা, তাকেও মেঘেদের মতো আর বাতাসের  মতো মুক্ত হতে হবে। ঘুমিয়ে পড়ার আগে জানালার পর্দা সরিয়ে ভোরের আকাশের রক্তিম আভায়ে ভেসে যাওয়া মেঘগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে মনে শপথ করলো অর্ক, বহু বছরের অপেক্ষা আর সাধনার পর পাওয়া এই ভালোলাগার অনুভূতিটিকে এবার  আর কোনোদিন  ও হারাতে দেবে না সে। 

*****

Posted in Bengali, short shory

স্বপ্নপূরণ

জুন  , ১৯৯০

বারান্দায় সাদা ফ্রক পরে রান্না বাটি  নিয়ে পা ছড়িয়ে বসে আছে ছোট্ট কোয়েল।  তার এখন গ্রীষ্মের ছুটি চলছে। বাবা অফিসে , মা সারাদিন রান্না করে, খাওয়া দাওয়ার পালা  শেষ করে পাশের ঘরে ভাইকে নিয়ে ঘুমোচ্ছে। তরীটা এলে মজা হতো, কি জানি মেয়েটা কোথায় ? সারাদিন শাড়াশব্দ পায়নি তার। তরী কোয়েলের সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু, ওরা পাশাপাশি বাড়িতে থাকে, একই স্কুলে পরে, একসাথে স্কুল যায়, একসাথে ফেরে। কোয়েলের এখন বছর দশেক বয়েস, এই দশ বছরের জীবনে একটা দিনও তার তরীকে ছাড়া কাটেনি। দুপুরে রান্না বাটি খেলার প্ল্যানটার কথা জানতো তরী, তবু কেন দেরি করছে সে ? আর ধর্য্য ধরতে না পেরে পাঁচিলের কাছে গিয়ে তরীকে ডাক দেয় কোয়েল। জানালার কাছেই গল্পের বই নিয়ে বসে ছিল তরী, বেরিয়ে এলো।

“কি রে, তোর জন্যে কখন থেকে বসে আছি, খেলতে আসবি না ?”, উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞাসা করলো কোয়েল।

 

“রান্না বাটি  খেলতে ইচ্ছে করছিলনা , তাই আসিনি।” তরীর জবাবে গাল ফুলে উঠলো কোয়েলের। 

 

প্রিয় বান্ধবী রেগে গিয়েছে দেখে ভারী বিপদে পড়লো তরী। অনেকক্ষন ভেবে বললো, “চল,  টিচার-টিচার খেলি।”

 

“আমার টিচার-টিচার খেলতে ইচ্ছে করছে না ” বলে রাগ করে মায়ের পাশে শুয়ে ঘুমোতে চলে গেল কোয়েল। 

 

তরীর এই হয়েছে এক বিপদ, যতদিন যাচ্ছে তত যেন তার কোয়েলের এই খেলাগুলোকে নিছক ছেলেমানুষি মনে হচ্ছে, রান্নাবাটি আবার একটা খেলা হলো ? কিন্তু অগত্যা প্রিয় বান্ধবীর মন রাখতে সেইদিন সন্ধেবেলা একঘন্টা রান্নাবান্না করলো তারা, গাদা ফুলের পাতা দিয়ে সবজি রাঁধলো, কৌটোর মুখ দিয়ে গোল করে পাতা কেটে লুচি বানালো, আর লাল গোলাপের পাপড়ি দিয়ে চাটনি। বাড়ির বড়রা খুব বাহবা দিয়ে মিছিমিছি খেলো সেটা। পরের দিন দুপুরে ‘টিচার টিচার’ খেলা হলো তরীর মন রাখতে। এই ভাবে খুব শিশু বয়েস থেকেই নিজেদের পার্থক্যগুলোকে দূরে সরিয়ে রেখে একসাথে মিলে  মিশে বড়  হতে লাগলো দুই বান্ধবী।

 
 ফেব্রূয়ারি, ২০০০
 এইরকম  বহু গ্রীষ্মের দুপুর খেলতে খেলতে কেটে গেছে তাদের । কোয়েল আর তরী এখন তারুণ্যে পা দিয়েছে। কলকাতার একটি নামি কলেজের  ছাত্রী তারা এখন। শীতের আমেজ কাটিয়ে কলকাতায় তখন গরম পড়তে শুরু করেছে সবে, কলেজ থেকে বেরিয়ে সামনের দোকানটিতে দুটো ঠান্ডা কোকাকোলার বোতল হাতে দাঁড়িয়ে দুজন। প্ল্যান হচ্ছে সামনের রবিবারের সিনেমা দেখার। তরীর অনেকদিন ধরে ইচ্ছে “পারমিতার একদিন ” দেখতে যাওয়ার, অন্যদিকে কোয়েলের ইচ্ছে সদ্য রিলিজ হওয়া হিন্দি সিনেমা “পুকার” দেখতে যাওয়ার। এত কঠিন সিনেমা ভালো লাগে না কোয়েলের, তার মনে হয় সিনেমা দেখা হয় বিনোদনের জন্যে, সিনেমা দেখে মন ভারাক্রান্ত করার কোনো মানে সে খুঁজে পায়না।। অন্যদিকে তরীর মত উল্টো, একটু আর্ট ফিল্ম গোছের সিনেমা না দেখলে তার ঠিক মন ভরে  না , মনে হয় সময়, টাকা দুটোই নষ্ট হলো।  আবার সেই টানাপোড়েন। অনেক তর্কাতর্কির পর ঠিক হলো পর পর দুটো সপ্তাহে দুটো সিনেমাই দেখা হবে। আবার আপোষ করে নিজেদের পার্থক্যগুলোকে দূরে সরিয়ে রাখলো দুই বান্ধবী। ‘
 

কলেজের দৈনন্দিন জীবনেও তাদের পার্থক্যগুলি বেশ চোখে পড়তে শুরু করেছিল। তরী অত্যন্ত জনপ্রিয়, সে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিতর্ক, মক পার্লামেন্ট, সব কিছুতে আগে। বই পড়া তার হবি, ক্লাসের প্রথম শ্রেণীর ছাত্রী সে, সব প্রফেসরের প্রিয় । কোয়েলকে কলেজের বেশিরভাগ ছাত্র ছাত্রী চিনতোই না, পড়াশুনায় নিতান্ত খারাপ সে নয়, কিন্তু সে বিষয়ে কোনো উচ্চাকাঙ্খা ও তার নেই। ভালো গান গায়ে, রান্নার হাত খুব সুন্দর, সেলাই করা তার হবি। নিতান্তই ঘরোয়া মেয়ে সে। তরীর মতো কলেজ দাপিয়ে বেড়ানোর ক্ষমতা তার নেই। তরী অবশ্য সব সময় তাকে উৎসাহ দিত গানের কম্পেটিশনে  বা অন্যান্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগদান করতে। তার ঘরকুনো বন্ধুর এই স্বভাবগুলো একদম পছন্দ করত না সে। কোয়েল অন্যদিকে মনে করতো তরীর মেয়ে হিসাবে আরেকটু ঘরোয়া হওয়া উচিত। দুই বান্ধবী মাঝে মাঝে দুজন দুজনকে জ্ঞান ও দিতো – একে অপরকে নিজের ধাঁচে তৈরী করার চেষ্টা করতো। কিন্তু এত পার্থক্য সত্ত্বেও এতো বছরের এই সম্পর্ক্যে কিন্তু বিন্দুমাত্র চিড় ধরে নি।  তাদের দেখে অনেকেই ঈর্ষা করতো, কারণ এরকম বন্ধু ভাগ্য সবার হয়না। 

 

ডিসেম্বর, ২০০৩

 কলেজ শেষ করে তরী এখন মাস্টার্স পড়ছে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে।  অনেক স্বপ্ন তার, আরো পড়াশোনা করার, একদিন কলেজ বা কোনো ইউনিভার্সিটির শিক্ষক হওয়ার। কোয়েল অবশ্য কলেজ পাশ করে আর পড়াশোনা করেনি। তরীর অনেক বোঝানো সত্ত্বেও কোনো ফল হয়নি। বান্ধবীর এই সিদ্ধান্তটা একদম মেনে নিতে পারেনি সে। কিন্তু কোয়েল যখন গান নিয়ে চর্চা শুরু করে, মনে মনে একটু শান্তি পায়ে তরী।  সকলকেই পড়াশোনার দিক দিয়ে বড়  হতে হবে এমনটা সে মানে না, কোয়েল সত্যিই ভালো গান গায়ে, ঠিক মতো চর্চা করলে খুব বড় শিল্পী হতে পারে একদিন।

কোয়েলের অবশ্য সেরকম কোনো উচ্চাকাঙ্খা ছিল না।  সে গান শিখছিলো তার ভালো লাগে বলে। নিতান্ত ঘরোয়া এই মেয়েটির স্বপ্ন আলাদা, সে স্বপ্ন দেখে একটি সুখের সংসার হবে, সে স্বপ্ন দেখে একটি সুন্দর বাড়ির যেটাকে সে নিজের হাতে করে গোছাবে, একটি সুন্দর বাগান যাতে নিজের হাতে ফুল লাগবে সে। তরী তার এই স্বপ্নগুলো বুঝতেই পারেনা। ঠিক যেমন তরীর উচ্চাকাংখাগুলো সে বুঝতে পারেনা। অনেক বুঝিয়েছে সে তরীকে যে স্বপ্ন দেখা ভালো, কিন্তু একটি মেয়ের তার পরিবার, সংসারের প্রতি অনেক দায়িত্ব থাকে। স্বপ্নের পিছনে ধেয়ে বেড়ালে ওই দায়িত্বগুলোকে ঠিক মতো পালন করতে পারবে না সে।  কিন্তু তরীর কিছুই বোধগম্য হয়নি। 

 

তাই ডিসেম্বরের এক বিকেলে যখন তরীর ঘরে খবরটি দিতে ঢোকে কোয়েল, সে আগের থেকেই জানতো তার বান্ধবীর প্রতিক্রিয়া কি হবে। বিছানায়ে একটি বই নিয়ে উপর হয়ে পড়ছিলো তরী, কোয়েলের পায়ের শব্দে মুখ তুলে তাকালো। “আরে তুই, আমি ভাবছিলাম একটু আগেই সন্ধে বেলা তোর ওখানে যাবো– “

 

তরীর কথা মাঝপথে থামিয়েই তার বিয়ের খবরটা দেয়  তাকে কোয়েল। জানুয়ারী তে বিয়ে, হটাৎ ঠিক হয়ে গেল সব, পার্থ আর তার  পরিবার তাকে দেখতে এসেছিলো একসপ্তাহ  আগে, আজ ফোনে জানালো মেয়ে পছন্দ হয়েছে। বনেদি পরিবারের ছেলে, তারা ঘরোয়া বৌ চায়, কিন্তু খুবই উচ্চশিক্ষিত পরিবার তাদের। পার্থকেও বেশ পছন্দ হয়েছে কোয়েলের। এই বিষয়ে তরীর অনুমোদন সে পাবে না জেনেই তরীকে আগের থেকে  কিছু জানায়নি সে । 

 

আকাশ থেকে পড়লো তরী। আজ সে এতটাই পর যে সব কিছু ঠিক ঠাক হওয়ার পর বাইরের লোকের মতো জানতে পারলো সে। সে আগে জানলে অবশ্যই আপত্তি করতো, কোয়েলের গান শেখা  এখনো অনেক বাকি, সবে তেইশে পা দিয়েছে সে ! আর একজন অচেনা অজানা লোক, যার সাথে তার একদিন আলাদা করে কথা ও হয়নি, তাকে কি করে বিয়ে করতে রাজি হয়ে গেল কোয়েল ? কিন্তু তার মতামতের যে বিশেষ মর্যাদা সে পাবে না তা এতক্ষনে বুঝে গেছিলো সে।  নিজের অভিমান, হতাশা চেপে রেখে হাসি মুখে আনুষ্ঠানিক কংগ্রাচুলেশন্সটা জানিয়ে দিলো ।  খালি কোয়েল যখন বেরিয়ে যাচ্ছিলো ঘর থেকে, তখন নিজেকে আর আটকাতে পারলো না, পিছন থেকে ডেকে বললো ” গানটা ছাড়িস না, আমার একটাই রিকোয়েস্ট ” । সকলের অলক্ষে দীর্ঘ দিনের এই বন্ধুত্বে কোথাও একটা চিড় ধরতে শুরু করলো।

 

অক্টোবর, ২০১৬

 সেই বিকেলটির পর প্রায় তেরো  বছর চলে গেছে। তরী এখন একজন ব্যস্ত মানুষ, তার ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্টের হেড সে, ক্লাস, সেমিনার, অফিস পলিটিক্স, স্টুডেন্টস পলিটিক্স সামলাতে তার দিন যায়।  বিয়ে সেও করেছে, কিন্তু তার নিজের পছন্দ করা মানুষটিকে। অর্ঘ্য তারই সহকর্মী ছিল, এখন জীবন সঙ্গী। তার ছেলের এখন বছর সাতেক  বয়েস, কলকাতার একটা নামি স্কুলের ছাত্র। ছেলের অবশ্য খুব অভিমান তার উপর।  মায়ের সময় নেই তার জন্যে। প্যারেন্ট টিচার মিটিঙে, তার স্পোর্টস ডে তে , তার পরীক্ষার দিনগুলোতে মা সাথে যেতে পারেনা।  সকালে উঠে ভালো মন্দ টিফিন করে দিতে পারেনা অন্যান্য বন্ধুদের মায়েদের মতন।  তরীর বিশ্বাস আরেকটু বড় হলে নিশ্চই বুঝতে পারবে সে তার মায়ের ব্যস্ততাটা । কিন্তু মাঝে মাঝে রাতের বেলা যখন ছেলে ঘুমিয়ে পরে, হাঁ করে তাকিয়ে থাকে তরী তার মুখের দিকে, দেখতে দেখতে কত বড়  হয়ে গেল, তার সামনেই অথচ যেন তার অলক্ষে। অর্ঘ্য বোঝে স্ত্রীর কাজের চাপটাকে, একই সাথে কাজ করে বলেই হয়তো।  কিন্তু তবু মাঝে মধ্যে বলে ফেলে যে তরী যদি আরেকটু সময় দিতো সংসারের দিকে হয়তো আরেকটু গোছানো সংসার হতো তার, অন্যান্য সহকর্মীদের মতো। মাঝে মধ্যে মনে হতো তরীর সব ছেড়ে দিয়ে শুধু বাড়ির দিকে মন দেবে, হাপিয়ে উঠছিলো  সে দুদিক সামলাতে গিয়ে।
 

দম ফেলার অবকাশ অবশ্য ছিল না কোয়েলের ও।  সকাল থেকে উঠে একান্নবর্তী পরিবারের সব কাজ তাকে প্রায়  একা হাতে সামলাতে হয় । তার ছেলেও এবছর এগারো  তে পা দিলো, তার স্কুল, টিউশন, ক্রিকেট কোচিং, পার্থর অফিসের টিফিন এগুলো তো সাথে আছেই। সারাদিন বাড়িতে থাকতে থাকতে দম  বন্ধ লাগে তার আজকাল। ছেলে বড় হয়েছে, তার সময় নেই মায়ের সাথে কথা বলার, তার নিজের জগতে সে ব্যস্ত। বরের কাজের প্রচুর চাপ, কোনোদিন একটু ছুটি নিতে বললে সে বলে,”সারাদিন বাড়িতে থাকো তো, বুঝবে না অফিসের কাজের চাপ”। ছেলের বন্ধুর মায়েরা সবাই কর্মরতা, তারাও ভাবে কোয়েলের সারাদিন কোনো কাজ নেই।  ছেলে আজকাল মাঝে মাঝেই বলে, “আমার বন্ধুদের মায়েদের দেখেছো, কত স্মার্ট, তোমার মতো বাড়িতে বসে থাকে না তারা” । আজকাল তো প্যারেন্ট টিচার মিটিং, স্পোর্টস সবেতে বাবাকে নিয়ে টানাটানি করে ছেলে। বন্ধুদের মর্ডার্ন মায়েদের সামনে নিজের মা কে নিয়ে যেতে বোধহয় তার লজ্জা করে। গানটা আর শেখা হয়নি কোয়েলের। এখন ইচ্ছে করে শিখতে, কিন্তু বরের উপর আরেকটা আর্থিক বোঝা চাপাতে তার ইচ্ছে করেনা, তাই আর কিছু বলে না তাকে। এমনিতেও অনেক চাপ পার্থর উপর। মাঝে মধ্যে যখন সংসারের এই বদ্ধতার মধ্যে থেকে হাপিয়ে ওঠে, তখন  মনে হয় সেই পুরোনো জীবনে ফিরে যেতে পারলে কি ভালোটাই না হতো ।

 

এই তেরো বছরে একেবারেই শিথিল হয়ে গাছে তরী  আর কোয়েলের সম্পর্ক।  প্রথম প্রথম চিঠি লেখা লিখি করেছে অনেকদিন। আস্তে আস্তে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে তারা। সামনে পুজো।কোয়েলের বাপের বাড়ির সবার জন্যে জামা কাপড় কেনার টাকা দিয়ে গিয়েছিলো পার্থ তার হাথে। বাবা, ছেলে কারোর সাথে যাওয়ার সময় নেই বলে একফাঁকে কোয়েল নিজেই চলে গেল সাউথ সিটি । কেনা কাটি করে ড্রাইভারকে ফোন করতে যাবে তখনি যেন মনে হলো ভীড়ের মধ্যে একটা খুব চেনা মুখ দেখতে পেল সে।  বিদেশ থেকে আসা  দুই ভিসিটিং প্রফেসরদের সাথে রেস্টুরেন্ট থেকে লাঞ্চ করে বেরোচ্ছে তরী। এত বছর পর ও কত ইয়ং লাগছে তাকে,  হালফ্যাশনের একটি সালোয়ার কামিজ পরে  কি স্মার্ট দেখাচ্ছে, চোখ ভোরে দেখতে লাগলো তাকে কোয়েল। হটাৎ পিছন ফিরে তাকে দেখতে পেয়ে থমকে গেল তরী ও। সুন্দর একটি লাল-সাদা  ঢাকাই আর  লাল টিপ্ পড়া কোয়েলকে দেখে ঠিক একটি লক্ষী প্রতিমার কথা মনে পড়লো তার। 

 

“কেমন আছিস ?” জিজ্ঞাসা করে উঠলো কোয়েল। “খুব ভালো, আর তুই?” উত্তর দিলো তরী।  ব্যস্ত শপিং মলের মধ্যে বিধিবৎ দু চারটে কথা বললো তারা। তরীর সাথে গেস্ট আছে, সময় তার নেই, যেমন কখনোই থাকে না। সময় অবশ্য নেই কোয়েলের ও।  বাড়ি ফিরতে হবে, ছেলে বর  আসার আগে, তাদের জলখাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। দুজন দুজনকে দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। দুজনের মনের মধ্যেই  জেগে উঠলো একই  প্রশ্ন, “তাহলে কি ওর  দৃষ্টিভঙ্গিটাই ঠিক ছিল। ওর মতো জীবন যদি আমার হতো ? এর চেয়ে নিশ্চই অনেক বেশি সুখী হতাম আমি ?” । ঈর্ষান্বিত দৃষ্টিতে দেখলো তারা একে ওপর কে। এতো কিছু ভাবতে ভাবতে দুজন খেয়ালই করলো না যে ছোটবেলার বান্ধবীটির ফোন নম্বর, ঠিকানা কিছুই নেওয়া হয়নি । একই পার্কিং লটে দাঁড়িয়ে থাকা পাশাপাশি দুটো গাড়িতে উঠে বসলো তারা। একই পথ দিয়ে শপিং মল থেকে বেরিয়ে দুদিকে চলে গেল দুটি গাড়ি, যে যার গন্তব্যের দিকে, যে যার বেছে নেওয়া  পথ দিয়ে।