Posted in Bengali, short shory

আমি শ্রীজিতা

কলকাতার এক বিশিষ্ট মহিলা কলেজের প্রেক্ষাগৃহ।  শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত এই বিশাল কক্ষটিতে আজ জমায়েত হয়েছে কলেজের সব ছাত্রী। মাইক  হাতে কলেজের অধক্ষ্যা ছাত্রীদের উদ্দেশ্য করে বলছেন-

“আজ আমাদের বিশেষ অতিথি এই কলেজের প্রাক্তন ছাত্রী এবং প্রখ্যাত অভিনেত্রী ও পরিচালিকা শ্রীজিতা মিত্র। তার পরিচালিত সর্বশেষ চলচ্চিত্রটি দেশের এবং বিদেশের নানান সমালোচকদের দ্বারা খুব প্রশংসিত হয়েছে এবং সম্মানিত কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে তার স্ক্রীনিংও হয়েছে। শ্রীজিতার এই সাফল্যে গর্বিত আমরা সকলেই। তাই আজ কলেজের বার্ষিক অনুষ্ঠানে তাকে বিশেষ ভাবে অনুরোধ করা হয়েছে ছাত্রীদের কিছু বলে অনুপ্রেণীত করার জন্যে। আমি এবার মঞ্চে ডেকে নিতে চাই আমাদের সকলের প্রিয় শ্রীজিতা মিত্রকে। “

করতালিতে ফেটে পড়লো সভাঘরটি। বিনীত ভাবে জোড়হাতে স্টেজ উঠে এলেন এক অপুরূপ সুন্দরী মধ্যবয়স্কা মহিলা। পরনে একটি সাদা খোলের উপর কাঁথা স্টিচের রুচিসম্পন্ন শাড়ি ও খোঁপায় দুটি সাদা গোলাপফুল ছাড়া আর কোনো সাজের আতিশয্য নেই।  কেউ ভাবতেই পারবে না ইনি এত বড় একজন অভিনেত্রী। মাইক  হাতে তুলে গলা পরিস্কার করে শুরু করলেন তার বক্তব্য–

“নমস্কার।  আমি শ্রীজিতা।  আমার কাজের সাথে হয়তো আপনারা অনেকেই পরিচিত। তাই সেইসব নিয়ে আজ আর কথা বলবো না।  কিন্তু এই কলেজের ছাত্রীরা যারা আজ জমায়েত হয়েছে আমার কথা শুনতে, তাদের আজকে আমি শোনাবো একটি গল্প। আমার জীবনের গল্প। প্রায় বছর কুড়ি আগে আমিও ছিলাম তোমাদেরই মধ্যে একজন। এই প্রেক্ষাগৃহে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে শুনতাম কত বিশিষ্ট প্রাক্তন ছাত্রীদের ভাষণ। দুচোখে ছিল কত স্বপ্ন, কত ইচ্ছে। ঠিক তোমাদেরই মতন।

ছোটথেকেই অভিনয়ের শখ ছিল।  স্কুল কলেজে অনেক নাটকে অভিনয় করেছি। তারপর সুযোগ পেলাম একটি নামী দলের সাথে স্টেজে নাটক করার। সেই থেকে টেলিভিশনে সিরিয়াল করার সুযোগ পেলাম। নায়িকার ভূমিকা। সেইসব এখন স্বপ্নের মতো মনে হয়।  তখন আমার প্রচুর অনুরাগী। রাস্তায় বেরোলেই লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো সবাই একটি অটোগ্রাফের জন্যে।  শুটিং, পার্টিস, বিদেশ সফর, তারপর কিছু সিনেমায় পার্ট করার সুযোগ….আমি যেন একটি স্বপ্নপুরীতে বাস করছিলাম।

কিন্তু বুঝতে পারিনি যে এই “সেলুলয়েডের ” জগৎটা  কত ঠুনকো, কত সংকীর্ণ। হটাৎ লক্ষ্য করলাম আমার ধীরে ধীরে একটু একটু করে ওজন বাড়তে শুরু করলো। প্রথমে ভাবলাম খাওয়া দাওয়ার অনিয়ম।  খাওয়া নিয়ন্ত্রণ করলাম, ব্যামের সময় বাড়ালাম, রোজ সাঁতার কাটা শুরু করলাম। তার পরও লক্ষ্য করলাম কিছুতেই নিজের ওজন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছি না।  এদিকে আমার ডিরেক্টর/প্রোডিউসারদের মাথায় হাত।  নায়িকা মোটা হলে নাকি সিনেমা চলবে না। কিছুটা বাধ্য হয়েই ডাক্তার দেখলাম। জানতে পারলাম আমার hypothyroidism আছে।  ডাক্তারের কথা মতো চলতে শুরু করলাম কিন্তু তাতেও বিশেষ লাভ হলো না।

ফলস্বরূপ আমাকে সিরিয়াল থেকে বাদ দিয়ে দেয়া হলো।  আস্তে আস্তে সিনেমার অফার পাওয়া বন্ধ হয়ে গেল।  আমি প্রচন্ড ভাবে বিষন্ন হয়ে পড়তে শুরু করলাম ক্রমাগত।  প্রতিটা ইন্টারভিউতে একই প্রশ্ন করা হলো আমাকে। কাগজে আমার চেহারা নিয়ে রম্য রচনা বেরোতে লাগলো। আমি চিৎকার করে সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম যে এটি একটি অসুখ। আমি অসুস্থ। হাসির খোরাক নই। কোনো লাভ হলো না। বাড়িতে ভুয়ো চিঠি আসতে লাগলো, বাংলা চলচিত্রের সবচেয়ে কুৎসিত অভিনেত্রী নাকি আমি।  যারা এতদিন আমার একটি অটোগ্রাফের জন্যে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো, তারা নিমেষে ভুলে গেল আমাকে। এক মুহূর্তে বুঝিয়ে দিলো, আমার চেহারাটাই সব ছিল,  প্রতিভার কোনো দাম নেই।

Stardom জিনিসটাই বড়ো ছলনাময়ী। আজ আছে কাল নেই। এক পলকের মধ্যে লোকে তোমায় আপন করে নিতে পারে, এক পলকে ভুলে যেতে পারে। আমার সাথেও তাই হলো।  কদিনের মধ্যে দেখলাম আমার হাতে কোনো কাজ নেই। এতগুলো বছর অভিনয়ে সমর্পন করার পর অন্য কাজ খুঁজে পাওয়া খুব শক্ত মনে হতে লাগলো। বিধবা মা, ছোট ভাইকে নিয়ে আমার জগৎ। কি করে মা কে বলি যে “মা, তোমার মেয়ে একদিন খুব বড় গলা করে বলেছিলো তোমাকে আর কাজ করতে হবে না, আমিই সব দায়িত্ব নেবো এখন থেকে। কিন্তু আজ আমি আবার বেকার। আমি যে নিজের কাছে নিজেই হেরে গেলাম মা”!

দিনের পর দিন নিজের অন্ধকার ঘরে কাটাতে শুরু করলাম। আয়নায় নিজেকে দেখলে রাগে জ্বলে পুড়ে উঠতাম। নিজেকে ঘেন্না করতে শুরু করেছিলাম। মনে হতো নিশ্চই আমারই ভুল, পুরো দুনিয়া তো আমাকেই দোষারোপ করছে। নিজের পরিবারের সামনে নিজেকে দোষী মনে হতে লাগলো। তারপর যখন দেখলাম আর পারছি না, মনে মনে ভাবলাম এই ব্যর্থ, অসফল জীবনটাকেই শেষ করে দেব।

এই সময়ই একদিন হটাৎ একটা চিঠি বাড়িতে এলো। আমার এক প্রাক্তন ফ্যান আমাকে চিঠি লিখে জিজ্ঞাসা করছে যে আমি অভিনয় করছি না কোনো আর। সে নাকি এখনো আমার ছবির অপেক্ষায় আছে।  প্রথমটা খুব হাসি পেলো। তারপর মনে হলো এই একটি মেয়ে অন্তত আমার চেহারা ছাপিয়ে আমার কাজটাকে মনে রেখেছে তাহলে। ঘরে বসে ভাবতে লাগলাম। কেন আমি অন্যের চোখে নিজের কদর খোঁজার চেষ্টা করছি। কেন অন্যদের এতটা অধিকার দিয়েছি আমার ব্যক্তিগত জীবন, আমার চেহারা, আমার শরীর নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করার। যদি তারা করেও বা , কেন আমি তাদের এতটা গুরুত্ব দেব। নায়িকা সুন্দরী “size 0” হবে কেন সব সময়; চেহারার সাথে গল্প বলার,  চলচ্চিত্রের গভীরতার কি সম্পর্ক ?

আমি ঠিক করলাম আর লুকিয়ে থাকবো না। হেরে যাবো না আর। নিজের জমানো যেটুকু টাকা ছিল তা দিয়ে একটা ছোট বাজেটের সিনেমা বানাবো। তাতে থাকবে না কোনো বড় অভিনেতা, সঙ্গে যুক্ত থাকবে না কোনো বড় নাম।  যদি এখনো এই পৃথিবীতে প্রতিভার কদর থাকে তাহলে অন্তত আজকের মতো একজন অনুরাগী আমায় এসে বলবে “দিদি, খুব ভালো কাজ করেছো”!

সেই সিনেমাটি  সমগ্র বিশ্বে সম্মানিত হলো, হটাৎ একজন নামকরা পরিচালক হিসাবে আমার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লো। যে প্রোডিউসাররা আমাকে একদিন প্রত্যাখ্যান করেছিল তারা ছুটে এলো আমার দোরগোড়ায় আমার সাথে কাজ করার জন্যে। তার মাঝে কিছু “critically  acclaimed” সিনেমাতে প্রমুখ চরিত্রে  অভিনয় করার আবার সুযোগ পেলাম। আজ আমি সাফল্যের শীর্ষে। অথচ একদিন সমাজের চোখরাঙানিকে ভয় পেয়ে লুকিয়ে ছিলাম অন্ধকার ঘরে, শেষ করে ফেলতে চাইছিলাম নিজের জীবনটাকে। কত পাওয়া অসম্পূর্ণ থেকে যেত বলতো!

এই কথাগুলো এই  কারণেই তোমাদের বলছি যাতে তোমরা বুঝতে পারো যে মানুষের চেহারা ছাপিয়ে তার মধ্যেকার প্রতিভাগুলিকে কদর দেয়া অনেক বেশি জরুরি। আজকে যারা বলছে আমাকে ছাড়া বাংলা চলচিত্রের ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যেত তারাই তো একদিন ঠেলে ফেলে দিয়েছিলো আমাকে। তাই নিজের কদর তোমাদের নিজেদের করতে শিখতে হবে, নিজেকে সুস্থ রাখো কিন্তু যারা সুস্থ হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে তাদের কখনো অসম্মান করো না। আর কখনো হার মেনে নিয়োনা। মনে রাখবে রাতের শেষেই কিন্তু দিন থাকে। দিনের আলো দেখার আগেই রণে ভঙ্গ দেয়া কি উচিত?

আমি শ্রীজিতা আর এই আমার গল্প। আমার এই কথাগুলোর মধ্যে দিয়ে যদি আমি তোমাদের মধ্যে একজনকেও অনুপ্রেরণা দিয়ে থাকতে পারি, সেটাই হবে আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমার সবচেয়ে বড় পাওনা। ধন্যবাদ। “

কয়েক মুহূর্তের নিস্তব্দতাকে চীরে ফেটে পড়লো করতালি। গ্রিনরুমের দরজার আড়ালে দাড়িয়ে ফুলের তোরা নামিয়ে রেখে চোখের কোনায় জমে থাকা একবিন্দু  জল মুছে ফেললেন  শ্রীজিতা। হর্ন বাজিয়ে কলেজের গেট থেকে বেরিয়ে গেলেন তার বিদেশি গাড়ি নিয়ে, ফেলে রেখে গেলেন এক ঘর মন্ত্রমুগ্ধ শ্রোতা, জ্বালিয়ে দিয়ে গেলেন তরুণ মনে আশা ও আত্মবিশ্বাসের দীপ।

Posted in Bengali, short shory

এক মুঠো আকাশ…..

আর্যর বিয়ের আর দিন চারেক বাকি। বাবার অবর্তমানে বিয়ের সম্পূর্ণ দায়িত্ব পড়েছে তার ভাই অর্কর উপর।  প্যারিসে নিজের রিসার্চ থেকে এক মাসের ছুটি নিয়ে কলকাতা চলে এসেছে অর্ক বেশ কিছুদিন হলো। মায়ের পক্ষে একা হাথে পুরোটা সামলানো সম্ভব হচ্ছিলো না আর । যমজ ভাইয়ের বিয়ের আয়োজনে কোনো ফাঁক রাখতে চায়না সে।  ঠিক বাবা থাকলে যেরকম আয়োজন হতো , তেমনটি করার চেষ্টা করছে  অর্ক । এত পরিশ্রম যাচ্ছে সারাদিন বলেই হয়তো আজ  সকালে উঠতে অনেকটা দেরি হয়ে গেল তার।  আজ মা আবার কল্যাণীতে মামাবাড়ি যাবে। ওদের কার্ড দিয়ে আজকের দিনটা ওখানে কাটিয়ে কাল ফিরবে। দুই ভাই আজ বাড়িতে একা। বিয়ের পর দুজন কি আদৌ এরকম সুযোগ আর পাবে একসাথে সময় কাটানোর ? তাই দুভাই  ঠিক করেছে আজ জমিয়ে আড্ডা দেবে। সারাটাদিন একসাথে কাটাবে। 

সাইড টেবিল থেকে চশমাটা  পরে ঘড়িটা দেখে নিলো অর্ক। প্রায়  ৯.৩০ টা ।  কেউ তাকে আর ডাকেনি সকালে। মায়ের বেরোনোর সময় তো হয়ে গেল প্রায়।  ফ্রেশ হয়ে নিচে নামার সময় সিঁড়ি থেকে মেঘনার গলার আওয়াজ পেলো। মেঘনা আজ এখানে? হটাৎ ? মেঘনা ওর ভাইয়ের হবু স্ত্রী। সবাই একই ক্লাসে পড়তো ওরা স্কুলে, সেই থেকে আর্য আর মেঘনার প্রেম, আজ দীর্ঘ চোদ্দ বছর পর সেই প্রেম পরিণতি পেতে চলেছে। কয়েক ধাপ সিঁড়ি দিয়ে নামতেই আরেকটা গলার আওয়াজ পেলো, খুব মিষ্টি একটা গলার আওয়াজ, খুব পরিচিত, খুব কাছের। আট বছর পর সেই আওয়াজটা শুনে হটাৎ গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো অর্কর। এই আওয়াজের সাথেই তো কত রাত্রি ফোনে গল্প করতে করতে ঘুমিয়েছে সে, কত গান গেয়েছে স্টেজে, কত ঝগড়া করেছে আর তারপর ফোনে সরি বলেছে। এই আট বছরে সে তো এই আওয়াজটাকে ভোলে নি,  কিন্তু আফসোস, আওয়াজটা যে তাকে ভুলে গিয়েছে !

 

সিঁড়ি তে সবার অলক্ষ্যে দাঁড়িয়ে নিজেকে শান্ত হওয়ার সময় দিলো সে। এতদিন পরে নিজের দুর্বলতাটা মেলে ধরতে সে রাজি নয় একেবারেই। বেশ কয়েক মিনিট নিজেকে শক্ত করে সিঁড়ি দিয়ে লিভিং রুমে প্রবেশ করলো সে। মা আর আর্যর সাথে সোফায় বসে গল্পে মশগুল রিয়া আর মেঘনা, ঠিক আগের মতো। কয়েক সেকেন্ড রিয়াকে ভালো করে দেখলো অর্ক, স্কুলে পড়া সেই টমবয়টা এখন সালোয়ার কামিজ, হাইলাইট করা লম্বা খোলা চুল আর ঝোলা কানের দুলের পিছনে হারিয়ে গেছে  কোথাও। এই মেয়েটা তার সাথে ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে সারা স্কুল জীবন মারামারি করে এসেছে ভাবতে পারবে কেউ ? মুখশ্রীটা   কি এতটাই সুন্দর ছিল না বয়েসের সাথে সৌন্দর্যটাও বেড়ে গাছে তার ? এখনও কি আগের মতো গান গায়ে সে ? চকলেট খায়? কার্টুন ভালোবাসে ? এখনো কি ডিটেক্টিভ গল্পে ডুবে থাকে?  হাজারটা প্রশ্ন  মনে একসাথে ভীড় করে এলো অর্কর। 

 

তাকে লক্ষ্য করে হটাৎ আর্য ডেকে ওঠায় এক ঝটকায়ে বাস্তবে ফিরে এলো অর্ক। এবার এক্টিং এর পালা। স্কুল  জীবনে করা যত নাটকে যেটুকু অভিনয় শিখেছে সে, এবার তা কাজে লাগানোর সময়। অল্প হেসে এগিয়ে গিয়ে হাত বাড়ালো রিয়ার দিকে। 

– হাই, অনেক দিন পর, কেমন আছিস?

– এই তো ভালো আছি, তোর খবর বল। 

হেসে উত্তর দিলো রিয়া। অর্ক বুঝলো নিজের শ্রেষ্ঠ অভিনয় করার জন্যে উঠে পরে লেগেছে রিয়াও। মনে মনে ভাবলো ” চ্যালেঞ্জ একসেপ্টেড ” ।

 

মেঘনা বলে উঠলো পাশ থেকে – “দেখ, আট বছর পর খুঁজে বের করেছি রিয়াকে। কত কাঠ খড় পোড়াতে হয়েছে।  কিন্তু একবার যখন পেলাম পরিষ্কার জানিয়ে দিলাম, আমার সেই ছোটবেলার বেস্ট ফ্রেন্ড না এলে আমি বিয়ের পিঁড়িতে বোসবই না।  জেদ  করে নিয়ে এলাম দেখ ওকে।”

 

– “বেশ করেছিস, কেন  রে কাকীমাটার কথাও এতদিন মনে পড়লো না একবার ও ?” ; মা বললো ।

 
– “সত্যি রিয়া, কত স্মৃতি বলতো আমাদের চার জনের ! এই শহরে একসাথে বড় হলাম।  এতদিন একটা ফোন পর্যন্ত করলি না ? কেন বলতো?”
 

আর্যর  শেষ প্রশ্নটার উত্তর সবাই জানতো। অর্কর গায়ে আবার কাঁটা দিয়ে উঠলো। রিয়া অবশ্য খুব সহজ ভাবেই উত্তরটা  দিলো ;

“বাবা বোম্বে ট্রান্সফার হয়ে গেল, আমিও পুনে চলে গেলাম পড়তে। তার পর চলে গেলাম লন্ডন হাইয়ার  স্টাডিজের জন্যে । এতো ব্যস্ততার মধ্যে আর কলকাতা আসাই হলো না।  তোমাদের সবার কথা খুব মনে পড়তো।”

 

রান্নার মাসি কে রিয়া আর মেঘনার জন্যে খাবারের ব্যবস্থা করতে বলে মা রওনা হলো মামা বাড়ির দিকে। মা চলে যাওয়াতে আবার সেই চারজনের দলটা তৈরী হয়ে গেল আগের মতো। বাকি তিনজন পুরোনো দিনের স্মৃতিচারনে ব্যস্ত। রিয়া এত স্বাবাবিক, সহজ ভাবে গল্প করছে যেন আট বছরটা আট দিন মাত্র। এতটাই কি ভালো অভিনেত্রী সে না সত্যি কিছু যায় আসে না তার? এত বছরে নিশ্চই তার জীবনে কেউ এসে গেছে? তার জন্যেই নিশ্চই এখন এত সাজ, এত পরিবর্তন? হঠাৎ অভিমান, ঈর্ষায় মাথা ঝা ঝা করে উঠলো তার।  খিদে তার অনেক্ষনই উড়ে গেছে, তাও উঠে নিজের জন্যে এককাপ কফি  বানালো।  স্ট্রং কফি আর মেয়েদের দামি পারফিউমের আড়ালেও সেই পরিচিত গন্ধটা আস্তে আস্তে পুরোনো দিনে ঠেলে নিয়ে গেল তাকে, সেই ছোটবেলার স্মৃতিগুলোর কাছে যেগুলোকে অনিচ্ছাসত্ত্বেও এখনো আঁখরে ধরে বসে আছে সে। 

 

*****

 

চার বন্ধু প্রায় একসাথে বড় হয়েছিল তারা। একই স্কুল, তার পর একই কলেজ। কোনোদিন কেউ কাউকে ছেড়ে থাকতে ওরা শেখেনি। রিয়া তো ওদের সাথে মিশে নিজেকে প্ৰায়ে ছেলেই ভাবতো। ক্রিকেট খেলতো ওদের থেকেও ভালো, ক্যারাটের মারে দুই ভাইকে নাজেহাল করতো, অর্ক যখন প্রথম বাইক কিনলো, রিয়া তার আগে সেটা চালাতে শিখে ফেলেছিলো আর বাইক নিয়ে সারা কলকাতা ঘুরে বেড়াতো। তাদের কলেজ ব্যান্ডে গান গেয়ে পাড়া মাতাতো। এই সব বাইক  নিয়ে মারামারি, ফুচকায়ে লংকার পরিমাণ নিয়ে ঝগড়া ঝাটি, নতুন গান লেখার প্রচেষ্টা আর গল্পের বই আর ক্লাসনোটস আদান প্রদানের  ফাঁকে কখন যে অর্ক এই ব্যতিক্রমী মেয়েটিকে ভালোবেসে ফেলেছিলো, নিজেও বুঝতে পারেনি। একদিন কলেজের শেষে বারান্দায় বসে ফেস্টের আলোচনা করার ফাঁকে ভয় ভয় নিজের মনের কথা যখন জানায় তাকে, জীবনে প্রথম দস্যি মেয়েটার মুখে একটা লাল আভা ফুটে উঠতে  দেখেছিলো সে। গোধূলি লগ্নে ওই সলজ্জ হাসিটা আজও  মনে দাগ কেটে আছে অর্কর।  

 

তার পর তিন বছর কেটেছিল স্বপ্নের মতো, রাতের পর রাত  ফোন, গল্পের বইয়ের পাতার আড়ালে চিঠি ও আনাড়ি হাথের কবিতা, কলেজের ক্লাস কেটে লুকিয়ে সিনেমা, দূর্গা পুজোর অঞ্জলীর ফাঁকে আড়চোখে একে অপরকে দেখে মুচকি হাসা, সরস্বতী পুজোয় রিয়াদের ফ্ল্যাটের বিশাল প্রতিমা রাত জেগে সাজানো, বইমেলায় পাশাপাশি বসে বেনফিশের চপ খাওয়া, রিয়ার প্রথম বানানো পাথরের মতো শক্ত কেকটাকে খেয়ে প্রশংসা করা, বার্থডে আর ভ্যালেন্টাইন্স ডে তে স্পেশাল গিফটের খোঁজে রাতকে দিন করা…..সবই এখন স্মৃতি।

 

এই স্পষ্ট বক্তা, মুক্ত মনের মেয়েটাকে অর্ক ভালোবাসতে পেরেছিলো ঠিকই, কিন্তু নিজের কাছে ধরে রাখতে পারেনি। হয়তো ধরে রাখার প্রচেষ্টাটাই ছিল তার সবচেয়ে বড় ভুল। কোথাও একটা রিয়ার স্বপ্নগুলোর মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল সে, তাই হয়তো তার থেকে দূরে রিয়ার পুনে পড়তে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা মেনে নিতে পারেনি অর্ক । আজন্মের সম্পর্কে ভাঙ্গন ধরতে শুরু করলো। দূরত্ব, অহংকার, আত্মাভিমান যেন খুঁড়ে খুঁড়ে খেতে লাগলো সম্পর্কটাকে।  একদিন ধস নামলো এবং তার গতিতে ছিটকে আলাদা হয়ে গেল রিয়া সবার থেকে। কোনোদিন পরস্পরকে খোঁজার চেষ্টাও করেনি তারা। বরং নিজেদের আরো দূরে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে নিজের দেশ, চেনা শহর, পরিচিত  মানুষগুলোর থেকেও দূরে চলে গেছে  তারা। আজ বিদেশের মাটিতে দুজনে আবার  করে গড়ে তুলেছে তাদের জগৎ – নতুন কিন্তু একটা অসম্পূর্ণ জগৎ। 

 
 *****
 

ঘন্টা দেড়েক আড্ডা দেয়ার পর মেঘনা জানালো তার এবার বাড়ি ফেরা উচিত। যোধপুর পার্ক এর পুরোনো ফ্ল্যাটটাতে রিয়া এখন এসে উঠেছে কদিনের জন্যে। কিছুটা জোর করেই আর্য অর্ককে পাঠালো গাড়িতে রিয়াকে ছেড়ে আসতে।  সারা দুনিয়া ঘোরাঘুরি করা এই মেয়েটি যে ট্যাক্সি করে  দিনেরবেলা ঠিক বাড়ি পৌঁছে যাবে, সেটা জানতো অর্ক। কিন্তু যখন দেখলো রিয়াও বিশেষ প্রতিবাদ করছে না তার থেকে লিফ্ট নিতে, তখন সে রাজি হয়ে গেল। নিজের সম্পূর্ণ মনোযোগ স্টিয়ারিং হুইলের  দিকে উপনিবিষ্ট করলো অর্ক। গাড়ির মধ্যেকার দম বন্ধ করা নিস্তব্ধতা দূর করতে রেডিওটা চালিয়ে  দিলো সে। অনুপম রায়ের  সদ্য রিলিজ হওয়া একটি গান  ভেসে এলো –

   

“ফুটকড়াই, অ্যান্টেনা, হাফ চিঠি, হাফ প্যাডেল

আয়না আর জলপরীর গল্প বল

বন্ধু চল…

সাপ লুডো, চিত্রহার, লোডশেডিং, শুকতারা

পাঁচসিকের দুঃখদের গল্প বল

বন্ধু চল

বন্ধু চল… বলটা লে.

রাখবো হাত তোর কাঁধে

গল্পেরা এই ঘাসে 

তোর টিমে তোর পাশে” 

         

গানটা শুনে কিছুটা আনমনা হয়ে গিয়েছিলো অর্ক। হঠাৎ রিয়ার কথায় যেন এক যুগের নিস্তব্ধতার বাঁধ ভাঙলো।

– “তোর কি বাড়ি ফেরার তাড়া  আছে?” 

 

– “না, কেন বলতো? ” ; খুব সাবধানে জিজ্ঞাসা করলো অর্ক।

 

– “কলকাতাটা একটু ঘুরে দেখতে ইচ্ছে করছে।”

 

অল্প হেসে রিয়ার বাড়ির দিক থেকে গাড়িটা ঘুরিয়ে দিলো অর্ক।  অনেক দিন পর চেনা বন্ধুর পাশে দাঁড়িয়ে প্রিন্সেপ ঘাটের হাওয়া খেলো, সেন্ট পলসের নিস্তব্দতায় দুজন মনে মনে প্রার্থনা করলো যেন এই দিনটা শেষ না হয় কোনোদিনো,  ভিক্টোরিয়ার বাইরে গল্প করতে করতে  বিট নুন দিয়ে বাদাম ভাজা খেলো,  বইপাড়া ঘুরে তাদের সেই ছোটবেলার প্রিয় লেখকদের সেকেন্ড হ্যান্ড ডিটেক্টিভ নভেল কিনলো, গড়িয়াহাটের ভীড় ঠেলে প্রচন্ড দাম দর করে রিয়া কানের দুল কিনলো এবং পড়ন্ত বিকেলে যখন প্রচন্ড খিদে পেলো, তখন পার্ক স্ট্রিটের সেই সবচেয়ে প্রিয় রেস্তোরাটার শীতল আলো আঁধারিতে গিয়ে বসলো দুজনে।  

 

চাইনিজ খেতে খেতে কথার ছলে দুজন দুজনকে জমে থাকা নানান প্রশ্ন করতে লাগলো।  শেষ পাতে যখন বিশাল আইস ক্রিমটাতে চামচ ডুবালো রিয়া, তার চোখে মুখে ফুটে ওঠা আনন্দ দেখে অর্ক বুঝলো বাইরের খোলসটার ভিতরে লুকিয়ে থাকা  মেয়েটি একফোঁটাও বদলায় নি। সাথে সাথে কোথাও একটা সেই সুপ্ত ইচ্ছেগুলো আবার মাথা চারা দিয়ে উঠতে শুরু করলো তার মনে।

দিনের শেষে যখন রিয়াকে তার বাড়ি নামিয়ে দিলো অর্ক , গাড়ি থেকে নামার আগে হটাৎ বলে উঠলো রিয়া ” জানিস অর্ক,  সত্যি কথা বলতে এই দিনটার লোভেই কলকাতা ফিরলাম এতদিন পরে। ভাবতে পারিনি এতো কিছুর পর আমার এই অন্যায় আব্দারটা  তুই রাখবি। থ্যাংক ইউ। “

কি উত্তর দেবে ভেবে পায়নি অর্ক। মাথা নিচু করে একটু হেসেছিলো মাত্র । 

 

*****

 

শীতের রাতে ডিনার করে দুই ভাই এক লেপের ভিতর ঢুকে অনেক রাত অব্ধি গল্প করলো সেইদিন। আর্য আর মেঘনা যে আজ ইচ্ছে করেই রিয়াকে ওদের বাড়ি নিয়ে এসেছিলো তা বুঝতে বাকি নেই অর্কর। অনেক রাতে যখন আর্য ঘুমিয়ে পড়লো, ল্যাপটপটা খুলে এই প্রথম ফেসবুকে রিয়াকে খুঁজলো অর্ক। অনেক সাহস সঞ্চয় করে একটা মেসেজ পাঠালো – “হাই” । যখন কয়েক মিনিটের মধ্যেই উত্তরে আরেকটা “হাই” এলো, অর্ক বুঝলো রাতের ঘুম তার একার ওড়েনি। সেই রাতে বহুযুগ পর মেসেজ আদান প্রদানের মাধ্যমে কথা বলতে বলতে আবার ভোর করলো দুজন। ল্যাপটপ রেখে একটা নিবিড় ভালোলাগার অনুভূতি নিয়ে শুয়ে পড়ার আগে কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে একবার দেখে নিলো ঘুমে অচৈতন্য ভাইটার মুখটা । ছোটোখাটো কিছু অমিল কে উপেক্ষা করলে ঠিক যেন তার নিজের প্রতিচ্ছবি। তাই হয়তো ওর এতদিনের না বলা কথা, একাকীত্ব আর চেপে রাখা দীর্ঘশ্বাসগুলোকে এত সহজে বুঝে ফেলেছিল আর্য। গাড়ির থেকে নামার আগে রিয়ার বলা কথাটা আবার মনে পড়লো তার। বয়েস এবং অভিজ্ঞতার সাথে অন্তত এইটুকু বুঝেছিলো সে, আকাশের মেঘের মতো হালকা, বাতাসের মতো মুক্ত মনের এই মেয়েটিকে পেতে গেলে তাকে মুষ্টি বদ্ধ করে রাখার প্রচেষ্টা বৃথা, তাকেও মেঘেদের মতো আর বাতাসের  মতো মুক্ত হতে হবে। ঘুমিয়ে পড়ার আগে জানালার পর্দা সরিয়ে ভোরের আকাশের রক্তিম আভায়ে ভেসে যাওয়া মেঘগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে মনে শপথ করলো অর্ক, বহু বছরের অপেক্ষা আর সাধনার পর পাওয়া এই ভালোলাগার অনুভূতিটিকে এবার  আর কোনোদিন  ও হারাতে দেবে না সে। 

*****

Posted in Bengali, short shory

স্বপ্নপূরণ

জুন  , ১৯৯০

বারান্দায় সাদা ফ্রক পরে রান্না বাটি  নিয়ে পা ছড়িয়ে বসে আছে ছোট্ট কোয়েল।  তার এখন গ্রীষ্মের ছুটি চলছে। বাবা অফিসে , মা সারাদিন রান্না করে, খাওয়া দাওয়ার পালা  শেষ করে পাশের ঘরে ভাইকে নিয়ে ঘুমোচ্ছে। তরীটা এলে মজা হতো, কি জানি মেয়েটা কোথায় ? সারাদিন শাড়াশব্দ পায়নি তার। তরী কোয়েলের সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু, ওরা পাশাপাশি বাড়িতে থাকে, একই স্কুলে পরে, একসাথে স্কুল যায়, একসাথে ফেরে। কোয়েলের এখন বছর দশেক বয়েস, এই দশ বছরের জীবনে একটা দিনও তার তরীকে ছাড়া কাটেনি। দুপুরে রান্না বাটি খেলার প্ল্যানটার কথা জানতো তরী, তবু কেন দেরি করছে সে ? আর ধর্য্য ধরতে না পেরে পাঁচিলের কাছে গিয়ে তরীকে ডাক দেয় কোয়েল। জানালার কাছেই গল্পের বই নিয়ে বসে ছিল তরী, বেরিয়ে এলো।

“কি রে, তোর জন্যে কখন থেকে বসে আছি, খেলতে আসবি না ?”, উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞাসা করলো কোয়েল।

 

“রান্না বাটি  খেলতে ইচ্ছে করছিলনা , তাই আসিনি।” তরীর জবাবে গাল ফুলে উঠলো কোয়েলের। 

 

প্রিয় বান্ধবী রেগে গিয়েছে দেখে ভারী বিপদে পড়লো তরী। অনেকক্ষন ভেবে বললো, “চল,  টিচার-টিচার খেলি।”

 

“আমার টিচার-টিচার খেলতে ইচ্ছে করছে না ” বলে রাগ করে মায়ের পাশে শুয়ে ঘুমোতে চলে গেল কোয়েল। 

 

তরীর এই হয়েছে এক বিপদ, যতদিন যাচ্ছে তত যেন তার কোয়েলের এই খেলাগুলোকে নিছক ছেলেমানুষি মনে হচ্ছে, রান্নাবাটি আবার একটা খেলা হলো ? কিন্তু অগত্যা প্রিয় বান্ধবীর মন রাখতে সেইদিন সন্ধেবেলা একঘন্টা রান্নাবান্না করলো তারা, গাদা ফুলের পাতা দিয়ে সবজি রাঁধলো, কৌটোর মুখ দিয়ে গোল করে পাতা কেটে লুচি বানালো, আর লাল গোলাপের পাপড়ি দিয়ে চাটনি। বাড়ির বড়রা খুব বাহবা দিয়ে মিছিমিছি খেলো সেটা। পরের দিন দুপুরে ‘টিচার টিচার’ খেলা হলো তরীর মন রাখতে। এই ভাবে খুব শিশু বয়েস থেকেই নিজেদের পার্থক্যগুলোকে দূরে সরিয়ে রেখে একসাথে মিলে  মিশে বড়  হতে লাগলো দুই বান্ধবী।

 
 ফেব্রূয়ারি, ২০০০
 এইরকম  বহু গ্রীষ্মের দুপুর খেলতে খেলতে কেটে গেছে তাদের । কোয়েল আর তরী এখন তারুণ্যে পা দিয়েছে। কলকাতার একটি নামি কলেজের  ছাত্রী তারা এখন। শীতের আমেজ কাটিয়ে কলকাতায় তখন গরম পড়তে শুরু করেছে সবে, কলেজ থেকে বেরিয়ে সামনের দোকানটিতে দুটো ঠান্ডা কোকাকোলার বোতল হাতে দাঁড়িয়ে দুজন। প্ল্যান হচ্ছে সামনের রবিবারের সিনেমা দেখার। তরীর অনেকদিন ধরে ইচ্ছে “পারমিতার একদিন ” দেখতে যাওয়ার, অন্যদিকে কোয়েলের ইচ্ছে সদ্য রিলিজ হওয়া হিন্দি সিনেমা “পুকার” দেখতে যাওয়ার। এত কঠিন সিনেমা ভালো লাগে না কোয়েলের, তার মনে হয় সিনেমা দেখা হয় বিনোদনের জন্যে, সিনেমা দেখে মন ভারাক্রান্ত করার কোনো মানে সে খুঁজে পায়না।। অন্যদিকে তরীর মত উল্টো, একটু আর্ট ফিল্ম গোছের সিনেমা না দেখলে তার ঠিক মন ভরে  না , মনে হয় সময়, টাকা দুটোই নষ্ট হলো।  আবার সেই টানাপোড়েন। অনেক তর্কাতর্কির পর ঠিক হলো পর পর দুটো সপ্তাহে দুটো সিনেমাই দেখা হবে। আবার আপোষ করে নিজেদের পার্থক্যগুলোকে দূরে সরিয়ে রাখলো দুই বান্ধবী। ‘
 

কলেজের দৈনন্দিন জীবনেও তাদের পার্থক্যগুলি বেশ চোখে পড়তে শুরু করেছিল। তরী অত্যন্ত জনপ্রিয়, সে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিতর্ক, মক পার্লামেন্ট, সব কিছুতে আগে। বই পড়া তার হবি, ক্লাসের প্রথম শ্রেণীর ছাত্রী সে, সব প্রফেসরের প্রিয় । কোয়েলকে কলেজের বেশিরভাগ ছাত্র ছাত্রী চিনতোই না, পড়াশুনায় নিতান্ত খারাপ সে নয়, কিন্তু সে বিষয়ে কোনো উচ্চাকাঙ্খা ও তার নেই। ভালো গান গায়ে, রান্নার হাত খুব সুন্দর, সেলাই করা তার হবি। নিতান্তই ঘরোয়া মেয়ে সে। তরীর মতো কলেজ দাপিয়ে বেড়ানোর ক্ষমতা তার নেই। তরী অবশ্য সব সময় তাকে উৎসাহ দিত গানের কম্পেটিশনে  বা অন্যান্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগদান করতে। তার ঘরকুনো বন্ধুর এই স্বভাবগুলো একদম পছন্দ করত না সে। কোয়েল অন্যদিকে মনে করতো তরীর মেয়ে হিসাবে আরেকটু ঘরোয়া হওয়া উচিত। দুই বান্ধবী মাঝে মাঝে দুজন দুজনকে জ্ঞান ও দিতো – একে অপরকে নিজের ধাঁচে তৈরী করার চেষ্টা করতো। কিন্তু এত পার্থক্য সত্ত্বেও এতো বছরের এই সম্পর্ক্যে কিন্তু বিন্দুমাত্র চিড় ধরে নি।  তাদের দেখে অনেকেই ঈর্ষা করতো, কারণ এরকম বন্ধু ভাগ্য সবার হয়না। 

 

ডিসেম্বর, ২০০৩

 কলেজ শেষ করে তরী এখন মাস্টার্স পড়ছে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে।  অনেক স্বপ্ন তার, আরো পড়াশোনা করার, একদিন কলেজ বা কোনো ইউনিভার্সিটির শিক্ষক হওয়ার। কোয়েল অবশ্য কলেজ পাশ করে আর পড়াশোনা করেনি। তরীর অনেক বোঝানো সত্ত্বেও কোনো ফল হয়নি। বান্ধবীর এই সিদ্ধান্তটা একদম মেনে নিতে পারেনি সে। কিন্তু কোয়েল যখন গান নিয়ে চর্চা শুরু করে, মনে মনে একটু শান্তি পায়ে তরী।  সকলকেই পড়াশোনার দিক দিয়ে বড়  হতে হবে এমনটা সে মানে না, কোয়েল সত্যিই ভালো গান গায়ে, ঠিক মতো চর্চা করলে খুব বড় শিল্পী হতে পারে একদিন।

কোয়েলের অবশ্য সেরকম কোনো উচ্চাকাঙ্খা ছিল না।  সে গান শিখছিলো তার ভালো লাগে বলে। নিতান্ত ঘরোয়া এই মেয়েটির স্বপ্ন আলাদা, সে স্বপ্ন দেখে একটি সুখের সংসার হবে, সে স্বপ্ন দেখে একটি সুন্দর বাড়ির যেটাকে সে নিজের হাতে করে গোছাবে, একটি সুন্দর বাগান যাতে নিজের হাতে ফুল লাগবে সে। তরী তার এই স্বপ্নগুলো বুঝতেই পারেনা। ঠিক যেমন তরীর উচ্চাকাংখাগুলো সে বুঝতে পারেনা। অনেক বুঝিয়েছে সে তরীকে যে স্বপ্ন দেখা ভালো, কিন্তু একটি মেয়ের তার পরিবার, সংসারের প্রতি অনেক দায়িত্ব থাকে। স্বপ্নের পিছনে ধেয়ে বেড়ালে ওই দায়িত্বগুলোকে ঠিক মতো পালন করতে পারবে না সে।  কিন্তু তরীর কিছুই বোধগম্য হয়নি। 

 

তাই ডিসেম্বরের এক বিকেলে যখন তরীর ঘরে খবরটি দিতে ঢোকে কোয়েল, সে আগের থেকেই জানতো তার বান্ধবীর প্রতিক্রিয়া কি হবে। বিছানায়ে একটি বই নিয়ে উপর হয়ে পড়ছিলো তরী, কোয়েলের পায়ের শব্দে মুখ তুলে তাকালো। “আরে তুই, আমি ভাবছিলাম একটু আগেই সন্ধে বেলা তোর ওখানে যাবো– “

 

তরীর কথা মাঝপথে থামিয়েই তার বিয়ের খবরটা দেয়  তাকে কোয়েল। জানুয়ারী তে বিয়ে, হটাৎ ঠিক হয়ে গেল সব, পার্থ আর তার  পরিবার তাকে দেখতে এসেছিলো একসপ্তাহ  আগে, আজ ফোনে জানালো মেয়ে পছন্দ হয়েছে। বনেদি পরিবারের ছেলে, তারা ঘরোয়া বৌ চায়, কিন্তু খুবই উচ্চশিক্ষিত পরিবার তাদের। পার্থকেও বেশ পছন্দ হয়েছে কোয়েলের। এই বিষয়ে তরীর অনুমোদন সে পাবে না জেনেই তরীকে আগের থেকে  কিছু জানায়নি সে । 

 

আকাশ থেকে পড়লো তরী। আজ সে এতটাই পর যে সব কিছু ঠিক ঠাক হওয়ার পর বাইরের লোকের মতো জানতে পারলো সে। সে আগে জানলে অবশ্যই আপত্তি করতো, কোয়েলের গান শেখা  এখনো অনেক বাকি, সবে তেইশে পা দিয়েছে সে ! আর একজন অচেনা অজানা লোক, যার সাথে তার একদিন আলাদা করে কথা ও হয়নি, তাকে কি করে বিয়ে করতে রাজি হয়ে গেল কোয়েল ? কিন্তু তার মতামতের যে বিশেষ মর্যাদা সে পাবে না তা এতক্ষনে বুঝে গেছিলো সে।  নিজের অভিমান, হতাশা চেপে রেখে হাসি মুখে আনুষ্ঠানিক কংগ্রাচুলেশন্সটা জানিয়ে দিলো ।  খালি কোয়েল যখন বেরিয়ে যাচ্ছিলো ঘর থেকে, তখন নিজেকে আর আটকাতে পারলো না, পিছন থেকে ডেকে বললো ” গানটা ছাড়িস না, আমার একটাই রিকোয়েস্ট ” । সকলের অলক্ষে দীর্ঘ দিনের এই বন্ধুত্বে কোথাও একটা চিড় ধরতে শুরু করলো।

 

অক্টোবর, ২০১৬

 সেই বিকেলটির পর প্রায় তেরো  বছর চলে গেছে। তরী এখন একজন ব্যস্ত মানুষ, তার ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্টের হেড সে, ক্লাস, সেমিনার, অফিস পলিটিক্স, স্টুডেন্টস পলিটিক্স সামলাতে তার দিন যায়।  বিয়ে সেও করেছে, কিন্তু তার নিজের পছন্দ করা মানুষটিকে। অর্ঘ্য তারই সহকর্মী ছিল, এখন জীবন সঙ্গী। তার ছেলের এখন বছর সাতেক  বয়েস, কলকাতার একটা নামি স্কুলের ছাত্র। ছেলের অবশ্য খুব অভিমান তার উপর।  মায়ের সময় নেই তার জন্যে। প্যারেন্ট টিচার মিটিঙে, তার স্পোর্টস ডে তে , তার পরীক্ষার দিনগুলোতে মা সাথে যেতে পারেনা।  সকালে উঠে ভালো মন্দ টিফিন করে দিতে পারেনা অন্যান্য বন্ধুদের মায়েদের মতন।  তরীর বিশ্বাস আরেকটু বড় হলে নিশ্চই বুঝতে পারবে সে তার মায়ের ব্যস্ততাটা । কিন্তু মাঝে মাঝে রাতের বেলা যখন ছেলে ঘুমিয়ে পরে, হাঁ করে তাকিয়ে থাকে তরী তার মুখের দিকে, দেখতে দেখতে কত বড়  হয়ে গেল, তার সামনেই অথচ যেন তার অলক্ষে। অর্ঘ্য বোঝে স্ত্রীর কাজের চাপটাকে, একই সাথে কাজ করে বলেই হয়তো।  কিন্তু তবু মাঝে মধ্যে বলে ফেলে যে তরী যদি আরেকটু সময় দিতো সংসারের দিকে হয়তো আরেকটু গোছানো সংসার হতো তার, অন্যান্য সহকর্মীদের মতো। মাঝে মধ্যে মনে হতো তরীর সব ছেড়ে দিয়ে শুধু বাড়ির দিকে মন দেবে, হাপিয়ে উঠছিলো  সে দুদিক সামলাতে গিয়ে।
 

দম ফেলার অবকাশ অবশ্য ছিল না কোয়েলের ও।  সকাল থেকে উঠে একান্নবর্তী পরিবারের সব কাজ তাকে প্রায়  একা হাতে সামলাতে হয় । তার ছেলেও এবছর এগারো  তে পা দিলো, তার স্কুল, টিউশন, ক্রিকেট কোচিং, পার্থর অফিসের টিফিন এগুলো তো সাথে আছেই। সারাদিন বাড়িতে থাকতে থাকতে দম  বন্ধ লাগে তার আজকাল। ছেলে বড় হয়েছে, তার সময় নেই মায়ের সাথে কথা বলার, তার নিজের জগতে সে ব্যস্ত। বরের কাজের প্রচুর চাপ, কোনোদিন একটু ছুটি নিতে বললে সে বলে,”সারাদিন বাড়িতে থাকো তো, বুঝবে না অফিসের কাজের চাপ”। ছেলের বন্ধুর মায়েরা সবাই কর্মরতা, তারাও ভাবে কোয়েলের সারাদিন কোনো কাজ নেই।  ছেলে আজকাল মাঝে মাঝেই বলে, “আমার বন্ধুদের মায়েদের দেখেছো, কত স্মার্ট, তোমার মতো বাড়িতে বসে থাকে না তারা” । আজকাল তো প্যারেন্ট টিচার মিটিং, স্পোর্টস সবেতে বাবাকে নিয়ে টানাটানি করে ছেলে। বন্ধুদের মর্ডার্ন মায়েদের সামনে নিজের মা কে নিয়ে যেতে বোধহয় তার লজ্জা করে। গানটা আর শেখা হয়নি কোয়েলের। এখন ইচ্ছে করে শিখতে, কিন্তু বরের উপর আরেকটা আর্থিক বোঝা চাপাতে তার ইচ্ছে করেনা, তাই আর কিছু বলে না তাকে। এমনিতেও অনেক চাপ পার্থর উপর। মাঝে মধ্যে যখন সংসারের এই বদ্ধতার মধ্যে থেকে হাপিয়ে ওঠে, তখন  মনে হয় সেই পুরোনো জীবনে ফিরে যেতে পারলে কি ভালোটাই না হতো ।

 

এই তেরো বছরে একেবারেই শিথিল হয়ে গাছে তরী  আর কোয়েলের সম্পর্ক।  প্রথম প্রথম চিঠি লেখা লিখি করেছে অনেকদিন। আস্তে আস্তে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে তারা। সামনে পুজো।কোয়েলের বাপের বাড়ির সবার জন্যে জামা কাপড় কেনার টাকা দিয়ে গিয়েছিলো পার্থ তার হাথে। বাবা, ছেলে কারোর সাথে যাওয়ার সময় নেই বলে একফাঁকে কোয়েল নিজেই চলে গেল সাউথ সিটি । কেনা কাটি করে ড্রাইভারকে ফোন করতে যাবে তখনি যেন মনে হলো ভীড়ের মধ্যে একটা খুব চেনা মুখ দেখতে পেল সে।  বিদেশ থেকে আসা  দুই ভিসিটিং প্রফেসরদের সাথে রেস্টুরেন্ট থেকে লাঞ্চ করে বেরোচ্ছে তরী। এত বছর পর ও কত ইয়ং লাগছে তাকে,  হালফ্যাশনের একটি সালোয়ার কামিজ পরে  কি স্মার্ট দেখাচ্ছে, চোখ ভোরে দেখতে লাগলো তাকে কোয়েল। হটাৎ পিছন ফিরে তাকে দেখতে পেয়ে থমকে গেল তরী ও। সুন্দর একটি লাল-সাদা  ঢাকাই আর  লাল টিপ্ পড়া কোয়েলকে দেখে ঠিক একটি লক্ষী প্রতিমার কথা মনে পড়লো তার। 

 

“কেমন আছিস ?” জিজ্ঞাসা করে উঠলো কোয়েল। “খুব ভালো, আর তুই?” উত্তর দিলো তরী।  ব্যস্ত শপিং মলের মধ্যে বিধিবৎ দু চারটে কথা বললো তারা। তরীর সাথে গেস্ট আছে, সময় তার নেই, যেমন কখনোই থাকে না। সময় অবশ্য নেই কোয়েলের ও।  বাড়ি ফিরতে হবে, ছেলে বর  আসার আগে, তাদের জলখাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। দুজন দুজনকে দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। দুজনের মনের মধ্যেই  জেগে উঠলো একই  প্রশ্ন, “তাহলে কি ওর  দৃষ্টিভঙ্গিটাই ঠিক ছিল। ওর মতো জীবন যদি আমার হতো ? এর চেয়ে নিশ্চই অনেক বেশি সুখী হতাম আমি ?” । ঈর্ষান্বিত দৃষ্টিতে দেখলো তারা একে ওপর কে। এতো কিছু ভাবতে ভাবতে দুজন খেয়ালই করলো না যে ছোটবেলার বান্ধবীটির ফোন নম্বর, ঠিকানা কিছুই নেওয়া হয়নি । একই পার্কিং লটে দাঁড়িয়ে থাকা পাশাপাশি দুটো গাড়িতে উঠে বসলো তারা। একই পথ দিয়ে শপিং মল থেকে বেরিয়ে দুদিকে চলে গেল দুটি গাড়ি, যে যার গন্তব্যের দিকে, যে যার বেছে নেওয়া  পথ দিয়ে।

Posted in Bengali, short shory

এক ঝাঁক ইচ্ছেডানা

চা বাগানে ঘেরা কুয়াশাছন্ন  পাহাড়ের কোলে একটি সুন্দর দ্বিতল  বাড়ি। গেট দিয়ে ঢুকতেই   নুড়ি বিছানো রাস্তার দুধারে সারি দিয়ে ইউক্যালিপ্টাস গাছ এবং  গ্যারেজের  সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দুটো দামি গাড়ি দেখলেই বোঝা যায় বাড়িটির মালিক বেশ অবস্থাপন্ন ।  ছিমছাম রুচিসম্মত ভাবে সাজানো বাড়িটির দোতালায় তিস্তার  ঘর।  ঘরের একপাশে বিশাল বইয়ের আলমারি, তার উপর লাইন দিয়ে সাজানো নানান রঙের ছোটবেলার সফ্ট টয়গুলি। ঘরের এক কোনে ওয়ার্ডরোবটা অবশ্য বইয়ের আলমারি থেকে অনেকটাই ছোট। বিছানার একধারে উপর করে রাখা একটি ইংলিশ নভেল, পাশে ছড়ানো রকমারি বুকমার্ক। নেটের পর্দা লাগানো  বিশাল কাঁচের জানালাগুলির  পাশ দিয়ে সারি দিয়ে  মেঘ ভেসে যাচ্ছে, মন খারাপ করা মেঘ! অন্যদিন অবশ্য এই মেঘগুলি তিস্তার  মন খারাপ করায়না, কিন্তু আজ যেন জানালার পাশে মেঘগুলি জমাট বেঁধেছে তাকে বিদায় জানাতে। তাদের ঘরের মেয়ে যে আর দুদিন পরে চলে যাবে নতুনের উদ্দেশ্যে, তাই বোধহয় মেঘেদেরও  আজ মুখ গম্ভীর।  যাওয়ার ইচ্ছে নেই তিস্তার ও, কিন্তু সে নিরুপায়।

 

দার্জিলিঙের একটি নাম করা স্কুল থেকে I.S.C. পাশ করেছে তিস্তা, জয়েন্ট এন্ট্রান্স এ ভালো rank করে কলকাতায়   ডাক্তারী পড়ার সুযোগ পেয়েছে সে । তার বাবা মাও কলকাতার বাড়িতে তার সাথে থাকবে এখন থেকে । বাবা ব্যবসার সব কাজ সামলাবে কলকাতার থেকে। তার বাবা মায়ের স্বপ্ন, একমাত্র মেয়ে ডাক্তার হবে। সেই স্বপ্ন পূরণ করতেই তাদের সপরিবারে দার্জিলিং ছাড়ার এই সিদ্ধান্ত।  

 

তার নিজের স্বপ্নগুলি অবশ্য একদমই আলাদা। সে চায় লিখতে। নিজেকে কবি  হিসাবে ভাবার দুঃসাহস অবশ্য তার নেই।  সে চায় শুধু  নিজের জন্যে লিখতে। এই জানালার পাশে বসেই তো পড়ার ফাঁকে ফাঁকে পাতার পর পাতা জুড়ে লিখতো সে কবিতা  ।  এই মেঘ, এই চা বাগান, এই পাহাড়, এদের নিয়ে তার কত ছন্দ রচনা করা এখনো বাকি। কিন্তু বাবা মা তা বোঝেন না।  অবশ্য বাড়িতে পার্টি থাকলে তাকে প্রায়ই তার স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করে শোনাতে হতো বাহবা কুড়ানোর জন্যে। কিন্তু বাবা মা বলেন Wordsworth হয়ে পেট ভরবে না, ডাক্তার তাকে হতেই হবে।  অগত্যা ইলেভেনে সাইন্স নেয়া, জয়েন্ট দেয়া আর এখন কলকাতা যাওয়া। 

 kanchanjungha-panorama

ডায়েরিটা  খুলে লিখতে বসলো সে।  নিজের কথা, এই মেঘ, পাহাড়, পাখি, আর চা বাগানের কথা, নিজের ইচ্ছে আর আকাঙ্খার কথা, তার ছোট বেলার দার্জিলিঙের কথা। কি জানি আবার কবে দেখা হবে এদের সাথে, আবার কবে বাড়ি ফেরা হবে।  দুদিন পরে যখন মালপত্র গাড়িতে তুলে, শেষ বারের মতো তাদের মালী লক্ষণ দাজুকে টাটা বলে সে গাড়িতে উঠলো, মন ভরে দেখে নিলো কাঞ্চনজঙ্গার শৃঙ্গটিকে । কদিন কুয়াশায় ঢাকা ছিল কাঞ্চনজঙ্গা, আজ যেন তাকে বিদায়  জানাতেই দেখা দিয়েছে ছলনাময় পর্বতশৃঙ্গটি।   মৌন প্রকৃতি যেন  তাকে বার বার প্রশ্ন করছিল , “আবার কবে দেখা হবে তিস্তা ?”, মনে মনে নিঃশব্দে শপথ করলো  সে “একদিন ঠিক ফিরে আসব “। 

 *******

  

সেই শপথের অবশ্য দশ বছর হয়ে গাছে। তিস্তা এখন Dr (Mrs) . Teesta  Basu  Roy,  কলকাতার একটি নামকরা প্রাইভেট হাসপাতালের সাথে যুক্ত, তার স্বামী তারই কলেজের সিনিয়র, ওই একই হাসপাতালের সাথে যুক্ত। তার বাবা মায়ের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। আলিপুরে সদ্য তৈরী হওয়া বহুতলে পনেরোতলার  উপরে তাদের ঝকঝকে নতুন ফ্ল্যাট। বিশাল কাঁচের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেই দেখা যায় পুরো শহরটা। না,পাহাড়, মেঘ ইত্যাদি দেখা যায়না। কিন্তু সে সবের কথা এখন তিস্তার মনেও পড়েনা। ব্যস্ত মানুষ সে, সকালে উঠে Gym যায়, ব্রেকফাস্ট করেই যে যার গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে  তারা দুজন, সারাদিন তো শ্বাস ফেলার সময় নেই, সন্ধেবেলা সহকর্মীদের বাড়িতে পার্টি না থাকলে বাড়ি ফিরে খুচখাচ কিছু রান্না করে ল্যাপটপ খুলে TV series দেখা। এই ব্যস্ত জীবনের কাজের চাপে দশ বছর আগের তিস্তা এখন হারিয়ে গাছে। সে এখন সামাজিক প্রতিষ্ঠা লাভের জন্য বেপরোয়া শহুরে প্রতিযোগিতায়ে এতটাই মত্ত যে অন্য কিছু নিয়ে ভাবার অবসর এখন আর নেই তার। 

 

পুজোয় কদিনের জন্যে ছুটি পেয়ে তার স্বামী, সৈকত, হটাৎ একটা উদ্ভট প্রস্তাব দিয়ে বসে। ঘুরতে যাওয়ার। প্রথমে তিস্তা ভেবেছিলো সৈকত তাদের ভেনিস যাওয়ার প্ল্যানটাকে নিয়ে নিশ্চই ভাবছে , কিন্তু অবাক হয়ে যায় যখন জানতে পারে সৈকত এত জায়গা থাকতে তার সেই ছোটবেলার দার্জিলিঙে যেতে চায়। আজীবন মুম্বাইয়ে বড় হওয়া সৈকতের দার্জিলিংটা কোনোই দেখাই হয়নি শুনে কিছুটা অনিচ্ছাসত্ত্বেও রাজি হয় তিস্তা। এক মাস পর, একটি হালকা শীতের সকালে দীর্ঘ দশ বছর পর দার্জিলিঙের বসুবাড়িতে ফিরে আসে বাড়ির মেয়ে। লক্ষণ দাজু এখনো বাড়ির দেখাশোনা করে, সেই ইউক্যালিপ্টাস গাছের সারি, নুড়ি বিছানো রাস্তা, সব যেন ঠিক আগের মতো আছে। তার ঘরে ঢুকে জানালার নেটের পর্দা সরিয়ে দাঁড়ালো তিস্তা, সেই দৃশ্য, সেই মেঘ….সবই যেন আগের মতো, কিন্তু কিছু একটা আলাদা। অনেক ভেবেও বুঝতে পারলো না কি আলাদা। স্তব্ধ প্রকৃতি অলক্ষে মাথা নেড়ে ভাবলো, “আমরা তো যুগযুগান্তর ধরে একই আছি, দেখার দৃষ্টিটাই হয়তো পাল্টে গাছে।”

সৈকতের আবদারে তাকে দার্জিলিং ঘোরাতে নিয়ে যেতে হলো তিস্তাকে। ছোটবেলার চেনা রাস্তাগুলো দিয়ে নতুন সঙ্গীর হাত ধরে ঘোরার অনুভূতিটাই যেন আলাদা, সেই পুরোনো ম্যালের রাস্তা, তার স্কুলে যাওয়ার রাস্তা , কেভেন্টার্সের ইংলিশ ব্রেকফাস্ট আর বিকেলে গ্লেনারিসের কফি। সৈকতের মুগ্ধ চোখ দিয়ে যেন নতুন করে দেখছিলো দার্জিলিংকে সে। ঘোরাঘুরির ফাঁকে একদিন হটাৎ পুরোনো বইয়ের আলমারিটা ঘাটতে গিয়ে হাথে পড়লো সেই পুরোনো কবিতার খাতাটা। ছোটবেলার সব স্বপ্ন, সব ভালোলাগা, খারাপ লাগা, চাওয়া পাওয়া যেন একমুহূর্তে চোখের সামনে ভেসে উঠলো তার । কচি হাথে লেখা কবিতাগুলোর মধ্যে দিয়ে যেন ফুটে উঠছিলো আগামীর স্বপ্ন। কিন্তু আজ দশ বছর পরে নিজের একটা স্বপ্নও কি পূর্ণ করতে পেরেছে সে? মনে হলো এই দশ বছর ধরে যে জগৎটা তৈরী করেছে সে, তা তো তার নিজের নয় , তা তো অন্যদের। হটাৎই নিজের কাছে নিজেকে অপরাধী মনে হতে থাকলো তার। কিন্তু এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে, মনে মনে হাসলো সে, ইচ্ছেডানাদের একবার কেটে ফেলে দিলে তাদের কি আর কখনো খুঁজে পাওয়া যায়? এখন যে পথটি নিজের জন্যে বেছে নিয়েছে সে, তা ধরেই এগিয়ে যেতে হবে তাকে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডায়েরিটি ফিরিয়ে রাখলো যথাস্থানে। সৈকত ক্যামেরা নিয়ে রেডি, বেরোতে দেরি হয়ে যাচ্ছে যে !

*******


এক সপ্তাহের ছুটি শেষ করে এবার কলকাতা ফেরার পালা। কবিতার ডায়েরিটা ব্যাগে ভরে নিলো তিস্তা, মনে হলো ফেলে আসা দিনগুলোর সবটুকু যেন সাথে নিয়ে যাচ্ছে সে । পুজোর ছুটির পর সবাই যখন নব উদ্দীপনায় কাজে যোগ দিয়েছে, তিস্তার মন পড়েছিল অন্য কোথাও। হাসপাতাল যেতে তার ইচ্ছে করে না, কাজে মন নেই, সব সময় যেন মন চায় সেই কাঁচের জানালাটার কাছে ফিরে যেতে, সেই পাহাড়ের স্তব্ধতার মধ্যে সান্ত্বনা খুঁজে পেতে। সৈকত ও লক্ষ্য করেছিল এই পরিবর্তনটি। একদিন রাতে ডিনারে বসে তিস্তা মাথা নিচু করে বললো সৈকতকে “আমার কি হলো বল তো , মনে হচ্ছে দার্জিলিং গিয়ে নিজেকে যেন হারিয়েই ফেলেছি ! ” কোনো উত্তর দেয়নি সৈকত।

diary-pen-and-tea-1.jpg

পরেরদিন বিকেলে হাসপাতাল থেকে ফিরে তিস্তা দেখলো টেবিলের উপর রাখা একটি সুন্দর নতুন ডায়েরি আর দামি একটি কলম। অবাক হয়ে ডায়েরিটি খুলে দেখে তাতে সৈকতের হাথের লেখায় “হারিয়ে ফেলোনি, খুঁজে পেয়েছো “। চোখ ঝাপসা হয়ে আসে তিস্তার। তাকিয়ে দেখে শরতের সাদা ফুরফুরে মেঘেরা এসে জমাট বেঁধেছে তার পনেরোতলার বিশাল কাঁচের জানালাটির পাশে। কলম তুলে দীর্ঘ দশ বছর পর লিখতে শুরু করলো তিস্তা। লিখলো কলকাতার মেঘেদের কথা, লিখলো সৈকতের কথা, লিখলো তার দশ বছর ধরে জমে থাকা অনুশোচনা আর ভুলগুলোর কথা। তিস্তার লেখায় এখন তরুণ, পাহাড়ি নদীর স্রোত নেই, প্রাণোচ্ছলতা নেই, আছে গঙ্গার গভীরতা, গাম্বীর্য আর অভিজ্ঞতার ছোঁয়া। মেঘেরা তবুও হাসলো, কারণ শুধু তারাই লক্ষ্য করলো যে নতুন করে খুঁজে পাওয়া ইচ্ছেডানাদের রূপটা এখনো একই রয়ে গেল ! তার লেখায় পাহাড়ি তিস্তার জল যেন এসে মিশলো সমতলের গঙ্গায়। কিন্তু এক রয়ে গেলো সমুদ্রের দিকে ধেঁয়ে চলার ইচ্ছেটুকু !

 
  
Posted in Bengali, short shory

কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি

সকাল থেকেই প্রতিমা খুব ব্যস্ত। অন্য রবিবারের  থেকে এই রবিবার সকালটা আলাদা। আজ তার অনেক কাজ, ঘর গোছানো, রান্না করা, মধুমিতাকে তৈরী করা।  মধুমিতা তার ছোট মেয়ে।  স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকেই দুই মেয়েকে প্রায়  একা হাথেই  মানুষ  করেছে প্রতিমা।  বড়  মেয়ে মধুশ্রী যেমন সুন্দরী তেমনি ঘরের কাজে পটু।  তার বিয়ে নিয়েও তাই সমস্যা হয়নি। বর  বিশাল মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি তে চাকরি করে, ভালো মাইনে, যাকে বলে আদর্শ জামাই। ছোটটাকে নিয়েই তার যত সমস্যা। পড়াশোনায় ভালো,  Ph. D. করছে, কিন্তু গায়ের রংটাই যে মেরে দিলো। এই নিয়ে ১০টা সম্মন্ধ ভেস্তে গেল শুধু গায়ের রঙের  জন্যে। ভগবান করে আজ যেন পাত্রপক্ষের পছন্দ হয়ে যায় তাকে। মেয়েটার একটা বিয়ে দিতে পারলেই প্রতিমা নিশ্চিন্ত।

 

পাশের ঘরের বারান্দায় রোদে ল্যাপটপ নিয়ে বসে কাজ করছে মধুমিতা। পরের সপ্তাহে একটা সেমিনার আছে তার।  বিকেলে তো কোনো কাজ হবে না।  তাকে দেখতে আসবে।  মধুমিতার কোনো উৎসাহ নেই সেই ব্যাপারে। ওই তো এসে বিচারকের  দৃষ্টি নিয়ে তার গায়ের রঙের খোটা দিয়ে চলে যাবে পাত্রপক্ষ। ছোটবেলার থেকেই তো শুনে শুনে কান পঁচে  গাছে তার।  তার জন্মের পর নাকি দিদা প্রচন্ড কান্নাকাটি করেছিল, ঠাকুমা মাকে এসে কথা শুনেই গেছিলো যে ঠিকমতো বাদাম দুধ খেলে এই দিনটা  দেখতে হতো না, আত্মীয়রা সবাই চুপিচুপি বলেছিল  “এবাবা !!! হাসপাতাল এ পাল্টে যায়নি তো? এই মেয়ের বিয়ে দেবে কি করে?” । এককথায় যাকে বলে বিষাদের ছায়া নেমে এসেছিলো পুরো পরিবারে । একমাত্র খুশি হয়েছিল তার বাবা; মাথা উঁচু করে বলেছিলো “আমার মেয়ের মতো সুন্দরী কেউ নেই, একদিন এই মেয়েই আমার মাথা উঁচু করে দেবে।” আজ বাবা থাকলে হয়তো এই পাত্রপক্ষের সামনে ইন্টারভিউ পর্বগুলোর হাত থেকে বেঁচে যেত সে।  কিন্তু মায়ের মন রাখতে বারবার রাজি হয়ে যায় পাত্রপক্ষের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে।  তারা তার হাটাচলা , চেহারা, চুল, গৃহকর্মে নিপুণতা সব কিছু নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে নাকচ করে  চলে যায় । এসব এখন আর নতুন লাগে না তার । 

 

“তুই আবার রোদে গিয়ে বসেছিস? এই মুসুরের ডাল বাটাটা  মাখ, রোদে পোড়া  ভাবটা  যদি একটু কমে। ” – মায়ের গলা শোনা গেল তার ঘরের দরজা থেকে। 

 

অন্য দিনের মতো আজ প্রতিবাদ না করে মেখে ফেললো মুসুরের ডাল বাটা,  কাঁথা  স্টিচের  শাড়িটাও পরে সেজে নিলো।  আয়না নাকি মেয়েদের সবচেয়ে ভালো বন্ধু। কিন্তু আয়নার দিকে তাকাতে তার কোনোদিন মন চায়না। দিদিকে মা আসতে  না করে দিয়েছে, পাছে  তার পাশে আরো কালো লাগে তাকে। পাত্রপক্ষ এলো ৪৫ মিনিট লেট্  করে।  ছেলের মা, দিদি ও পাত্র নিজে এসেছে । ছেলেটি উচ্চ শিক্ষত, IIT থেকে পড়াশোনা করা, দেশবিদেশের নানান বই পড়া তার শখ।  মধুমিতার সাথে বই  আর পুরনো  দিনের সিনেমা নিয়েই তার আলোচনা চললো অনেক্ষন। অর্পণ যখন তার বইয়ের আলমারিটি   দেখার ইচ্ছে প্রকাশ করে, মধুমিতা তাকে পাশের ঘরে নিয়ে যায় তার bookshelf দেখাতে। কথা বলতে বলতে মধুমিতার মনে হতে থাকে, এতটা মনের মিল থাকতে পারে কখনো দুটো মানুষের মধ্যে? 

 

পাশের ঘরে লুচি মাংসের প্লেট নামিয়ে মিষ্টির প্লেট হাথে তুলে  এই সুযোগে অর্পণ এর মা প্রতিমাকে বললেন “Mrs. Debnath, আমরা কিন্তু প্রথমেই বলেছিলাম আমাদের প্রকৃত সুন্দরী মেয়ে চাই।  আমাদের ছেলে ইঞ্জিনিয়ার, বড় চাকরি , তার সাথে মানানসই হতে হবে তো? আপনি যদি ফোন এ বলে দিতেন মেয়ের গায়ের রং কালো, আমরা কষ্ট করে আসতামই না।  আমাদের সময়ের তো একটা দাম আছে? ”  দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা মধুমিতা শুনতে পায়  সবটা, লজ্জায় অর্পণ এর মাথা নিচু হয়ে যায়, কিন্তু মায়ের কথার প্রতিবাদে  একটি কথাও সে বললোনা  ।  প্রতিমা অপরাধীর মতো মুখ করে ক্ষমা প্রার্থনা  করে তাদের কাছে। রাগে ঘেন্নায় গা রিরি করে ওঠে মধুমিতার, তার শিক্ষা দীক্ষা, পড়াশোনা, গুণগুলির কোনো মূল্যই কি তাহলে নেই? 

 

“আপনারা তাহলে আসতে পারেন। বৃথা কথা বাড়িয়ে আপনাদের ও আমাদের সময় নষ্ট করার মানে হয় না । নমস্কার। ” ; হঠাৎই ফোঁস করে বলে ওঠে মধুমিতা। 

 

মিষ্টির প্লেট নামিয়ে রাগ করে বেরিয়ে যায়  অর্পনের পরিবার, এখনো মুখ ফুটে কিছু বললনা অর্পণ নিজে।

                                                                  *******

                                                                        

এই ঘটনার একসপ্তাহ হয়ে গাছে। মায়ের সাথে সেই থেকে তার কথাবার্তা বন্ধ, মেয়ের এই মুখোরাপনার  খবর রটে যাওয়ার ভয়ে মা প্রায় শয্যাশায়ী , দিদিকে ডেকে পাঠানো হয়েছে মা কে সামলাতে। ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরি তে বসে কাজে মন দেয়ার চেষ্টা করছে মধুমিতা, যখন হঠাৎই তার ফোনটা ভাইব্রেট করতে শুরু করে।  অচেনা নম্বর, অর্পণের গলা।  অনেক্ষন ধরে ক্ষমা চায় তার মায়ের ব্যবহারের জন্যে, দেখা করতে চায় একদিন। আরেকটি সুযোগ দিতে মন চাইলো মধুমিতার। সেই থেকে অফিসের পাশের কফি শপে  প্রায়ই আসতে  শুরু করে  অর্পণ। সময় চেয়ে নেয়  মাকে বোঝানোর জন্যে , প্রতিশ্রুতি দেয় তাদের এই  ভালোলাগাকে পরিণতি সে দেবেই।

একদিন এসে বললো যদি মধুমিতা  তার মায়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে নেয় তাহলে সে হয়তো তার মাকে  বুঝিয়ে বলতে পারে। কিন্তু তার পরিবার যে অপমানটা করেছিল তাকে? তারবেলা? আবার  কোনো উত্তর ফুটলো না অর্পনের মুখে। যে জীবনসঙ্গী তার জন্যে রুখে  দাঁড়াতে পারবে না, গলা উঁচু করে তার পক্ষে কথা বলতে পারবেনা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করার যার শিরদাঁড়া নেই, এমন জীবনসঙ্গী পাওয়ার থেকে একা থাকাই ভালো মনে হলো তার । নিজের ভাগের কফির বিলটা চুকিয়ে দিয়ে বেরিয়ে এলো কফিশপ থেকে।  ট্যাক্সি ধরে বাড়ীর দিকে রওনা হলো। 

  

ট্যাক্সির রিয়ারভিউ মিররে হটাৎই দেখতে চোখ পড়লো নিজের প্রতিচ্ছবির উপর।  ঝাপসা চোখে ভালোকরে  দেখলো নিজেকে ।  হঠাৎ মনে পড়লো ভুলে যাওয়া একটি দিনের কথা। সে তখন ক্লাস টুতে, খুব ভালো নাটক করতো, টিচাররা খুব প্রশংসাও করতো, কিন্তু Snow white নাটকে তাকে অডিশন দিতে দেয়া হলো না।  সেইদিনও অনেকটা আজকের মতোই মেঘলা ছিল। তার বাবা তাকে সেইদিন আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে বলেছিলো , “মা, অন্যের চোখে নিজের মর্যাদা কখনো খুঁজিস না।  অনেকে ভালোবাসার আগে নিজেকে ভালোবাসতে শিখিস। মনে রাখবি তুই অনন্যা, কারণ তোর মতন পৃথিবী তে আর কেউ নেই।  যে তোর  বাইরের রূপ কে ছাপিয়ে ভিতরের সৌন্দর্য কে দেখতে পাবে, সেই বুঝবে তোর আসল কদর ” । মেঘ সরে গিয়ে হঠাৎ যেন একটু  রোদ  উঠলো। থমথমে মুখের আধার কেটে অল্প হাসি ফুটলো। ঠিক করলো আর কারোর জন্যে কোনোদিন হীনমন্যতায় ভুগবে না সে, নিজের নিয়মে, নিজের মতো করে সাজিয়ে তুলবে নিজের জীবনটাকে, ঠিক যেমন তার বাবা চেয়েছিলো।

                                                                     

                                                                      ********

সেই দিন বাড়ি ফিরে ডাস্টবিনে ফেলে দেয় সব fairness ক্রিম, ফোন তুলে যোগাযোগ করে নিজের ছোটবেলার সেই বন্ধুগুলোকে যাদের সাথে একদিন একটা নাটকের group করবে ভেবেছিলো মধুমিতা। আজ পাঁচ  বছর পর নানান ব্যর্থতা, নানান সমালোচনা পেরিয়ে আজ তাদের দলটির বেশ নাম হয়েছে। তার প্রতিভার কদর সে পেতে শুরু করেছে।  নাটকের  সাথে সাথে নিজের রিসার্চ শেষ করে সে এখন পোস্টডক্টরাল ফেলো, সাথে একটি কলেজের পার্ট টাইম লেকচারার ও। নিজেকে যেন নতুন করে খুঁজে  পেয়েছে সে আবার।  প্রতিমাও  ছেলে খোঁজার অনেক ব্যর্থ  অনুরোধের পর এখন মেনে নিয়েছে যে এই মেয়ের আর বিয়ে হবে না।  কিন্তু মধুমিতা মুখে যাই বলুক, তার সরল কল্পনাপ্রবণ মনটি  জানতো, কেউ না কেউ ঠিক একদিন তার বাইরের খোলসটাকে  উপেক্ষা করে ভিতরের মনটাকে দেখে পাবে। 

 

একাডেমিতে  তাদের দল প্রথমবার পারফর্ম করার সুযোগ পেয়েছে। ডিরেক্টর পিনাকীদা খুব খুঁতখুঁতে মানুষ, তাই রিহার্সালের পিছনে অনেকটা সময় দিতে হচ্ছে আজকাল ।এক ফাঁকে হঠাৎ পিনাকী দা এসে মধুমিতা কে বললো “চল , এক কাপ চা খেয়ে আসি ” । মধুমিতার কলেজের সিনিযার  পিনাকী দা, লেখক এবং লেকচারার।  কলেজ লাইফ থেকে নাটকে তার ছিল খুব ইন্টারেস্ট।  বহুযুগ  একটি নাটকের দলের সাথে যুক্তও  ছিল, মনমালিন্য হওয়ায় তা ছেড়ে দেয়, এখন তাদের দলের ডিরেক্টর।  আজ সকাল থেকেই তাকে একটু অন্যমনস্ক লাগছিলো, চা খেতে খেতে হঠাৎ তাকে প্রপজ  করে বসে। মধুমিতা প্রথমে কিছুটা হতভম্ব হয়ে যায়, তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে  হাসতে হাসতে বলে, “ভেবে দেখো পিনাকীদা, পরে সারাজীবন কালো বৌ নিয়ে আফসোস করবে না তো? “

 

সেইদিনের পর দুদিন চলে গাছে, পিনাকীদাও  আর সেই থেকে কিছু বলেনি। প্রত্যাখ্যান অবশ্য মধুমিতার অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গিয়েছে , তাও যেন  মনের মধ্যে কোথাও একটা কুয়াশা জমে ছিল।  রিহের্সালের  শেষে যখন সে বাড়ি ফেরার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছে , পিনাকীদা তাকে স্ক্রিপ্টের একটি নতুন কপি দিয়ে বললো “কিছু চেঞ্জেস করেছি, আজ রাতেই খুলে দেখিস।” বাড়ি ফিরে স্ক্রিপ্টের কপিটা খুলতেই তার থেকে পড়লো একটি কাগজ।  না, চিঠি নয়, তাতে মুক্তোর মতো হাথের লেখায়  লেখা শুধু কয়েকটি লাইন। 

 

এমনি করে কালো কাজল মেঘ জ্যৈষ্ঠ মাসে আসে ঈশান কোণে।

 

এমনি করে কালো কোমল ছায়া আষাঢ় মাসে নামে তমাল-বনে।

এমনি করে শ্রাবণ-রজনীতে, হঠাৎ খুশি ঘনিয়ে আসে চিতে।

কালো? তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।

 

কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি……..”

 

মনের ভিতরের কুয়াশাটা হঠাৎই উধাও হয়ে গেল, ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে নিজেকে দেখে নিলো ভালো করে একবার, সত্যি তো, কি সুন্দর তার চোখ দুটি, এই গায়ের রং ছাপিয়ে নিজেও লক্ষই করেনি কোনোদিন। ড্রয়ার থেকে কাজলটা তুলে ভালো করে বুলিয়ে নিলো দুচোখে, দরজা খুলে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো। পড়ন্ত বিকেলের বসন্তের হাওয়ায় পাশের গাছটিতে বসা কোকিলটির সাথে গলা মিলিয়ে, প্রাণ খুলে গেয়ে উঠলো সেই গানটি ….”কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি ”