Posted in Bengali, short shory

অন্য পুজো

“মা, আজ অফিস থেকে ফিরতে দেরি হবে, আবিরের সাথে পুজো শপিংএ যাবো!”

ব্রেকফাস্ট খেতে খেতে কাজে ব্যস্ত সাবিত্রী দেবীকে জানালো তার একমাত্র মেয়ে তিস্তা।  সাবিত্রী দেবীর তখন নিজেরও অফিসে যাওয়ার তাড়া, তবুও হবু জামাইয়ের জন্যে কিছু টাকা এনে মেয়ের হাতে গুঁজে দিয়ে বললেন, “আবিরকে আমার হয়ে পুজোর জন্যে ভালো কিছু কিনে দিস এটা দিয়ে। ” তারপর ভয়ে ভয়ে যোগ করলেন, “এতে হবে তো রে?”

“আবিরের জন্যে তো ব্র্যান্ডেড ছাড়া কিনে লাভ নেই, ও  পরবে  না ! তুমি বরং আরেকটু দাও। “

মেয়ের হাতে আরো কিছু টাকা দিয়ে নিশ্চিন্ত হলেন সাবিত্রী দেবী। এত কাজের মধ্যে পুজো শপিংটা করার সময়ই হচ্ছিলো না। যাক তিস্তা আজ শপিং করতে গিয়ে ভালোই করছে !

ইতিমধ্যে কর্নফ্লেকসের বাটি খালি করে টেবিল থেকে উঠে পড়েছে তিস্তা। পুজোর আর মোটে দিন কুড়ি বাকি। খুব কড়া ডিয়েটিং করছে মেয়ে এবার। আবিরের বন্ধুদের সাথে এবার প্রথম রাত জেগে পুজো দেখার প্ল্যান হয়েছে, তারা যেন তাকে মোটা বলার কোনো সুযোগই না পায়ে, মনে মনে ভাবলো তিস্তা। এবছর প্রথম আবিরের সাথে ঠাকুর দেখবে, সে চায় এবাবের পুজোটা হোক অন্য সববারের থেকে আলাদা, অন্য সববারের থেকে সেরা। 

দুপুরের স্যালাডটা ব্যাগে ভরে বেরিয়ে পড়লো সে গাড়ি নিয়ে অফিসের দিকে। রিয়ার ভিউ মিরররের দিকে এক ঝলক তাকিয়ে ভাবলো, ইশ, হেয়ার স্পা আর ফেসিয়ালটা করতে হবে তো, পার্লারে বুকিং নিতে হবে এর মধ্যেই !” 

অন্যমনস্ক ভাবে হাত বাড়িয়ে রেডিওটা অন করলো সে, সকালে এই সময়টুকুই  একটু রেডিও শোনার অভ্যেস তার। একজন রেডিও জকি আবোলতাবোল বকে চলেছে, উফ্, এরা গান কম শোনায়, বকবক বেশি করে, বিরক্ত ভাবে ভাবলো তিস্তা।

“এবার পুজো কেমন ভাবে কাটাবেন আপনারা? কি আশা করছেন? নতুন কি করতে চান? চটপট ফোন করে জানান আমাদের।” বলে চলছিলো একজন  RJ, “এই তো আমাদের প্রথম বন্ধুটির ফোন এসে গেছে, চলুন দেখি  আমাদের এই কলার বন্ধুটি পুজো কিভাবে কাটাতে চান?”

একে অফিস টাইম, তার উপর বৃষ্টি, রাস্তার উপর মনোযোগ করে গাড়ি চালাতে চালাতে অন্যমনস্ক ভাবে শুনছিলো তিস্তা রেডিওটা। 

“হ্যালো, আমার নাম তিস্তা”  কচি শিশুকণ্ঠে নিজের নাম শুনে হটাৎ চমকে উঠলো তিস্তা। রেডিওর আওয়াজটা আরেকটু বাড়িয়ে দিলো সে। 

RJ তখন বলছিলো “বলো তিস্তা, কি ভাবে কাটাতে তোমার পুজো?”

“নতুন জামা পরে। ” চট করে এলো শিশু কণ্ঠের উত্তর।

RJ হেসে উঠলো, “সে তো সবাই পরে তিস্তা! তা তোমার কটা নতুন জামা হয়েছে?”

“এখনো একটাও হয়নি ! তবে আন্টি বলেছে কাকুদের বাড়ি থেকে যে জামাগুলো এসেছে, ওগুলো নতুন করে দেবে আমাদের।”

কিছুটা হতভম্ব RJ বলে উঠলো, “নতুন করে দেবে মানে? তুমি কি আন্টির সাথে থাকো?”

সলজ্জ কচি কণ্ঠের উত্তর এলো, “হ্যাঁ “!

-“তোমার আন্টির সাথে কথা বলতে পারি?”

ফোনে এলেন এক বয়স্ক মহিলা, “হ্যালো?”

– “আচ্ছা দিদি, এই কাকুদের জামা নতুন করে দেয়ার ব্যাপারটা কি? তিস্তা বললো আপনি ওর আন্টি, একটু বুঝিয়ে বলতে পারবেন?”

– “আসলে দিদি, এটি একটি অনাথাশ্রম। আমি এখানে কাজ করি। পুজোয় এতগুলো বাচ্চাকে তো জামা দেয়া সম্ভব হয়না, তাই ডোনেশনে যে পুরোনো জামা আসে, ওটাই আমরা সেলাই করে ধুয়ে দেই ওদের। নতুন জামা তো পুজোতে পায়না, তাই মনের ইচ্ছেটা বোধহয় আপনাদের ফোনে জানিয়েছে ।”

RJর মতো কণ্ঠরুদ্ধ হয়ে এলো তিস্তারও। একই শহরে একই চাহিদা নিয়ে একই পুজো দেখবে দুটি একই নামের মেয়ে। অথচ কত পার্থক্য দুজনের জগতে! নিজের ছোটবেলার কথা মনে পড়লো তার। ছোট্ট তিস্তার পুজো মানেই তো ছিল কটা নতুন জামা হলো! আর এই ছোট্ট তিস্তা কিনা আজ পর্যন্ত পুজোতে একটা নতুন জামা পায়নি? স্তম্ভিত রেডিও জকিও নিজেকে সামলানোর জন্যে একটি গান চালিয়ে আশ্রয় নিলো তার আড়ালে। কিন্তু একটা ভাবনা সারাদিন ব্যথিত করতে থাকলো তিস্তাকে, “কেন এই বৈষম্য, কেন এই বিভেদ?”! মনের ভিতর থেকে যেন একটাই উত্তর সে পেলো বারংবার “কারণ এই বিভেদ দূর করার কোনো চেষ্টাই আমরা করিনি”!

বিকেলে কিছুটা আনমনা হয়েই  শপিং মলের বাইরে দেখা করলো সে আবিরের সাথে। মায়ের কথা মত একটা ভালো জামাও  কিনে দিলো সে আবিরকে।

-“তুমি কিছু নিলে না? চলো, এবার তোমার শপিংটা করি। ” আবির বলে উঠলো তিস্তাকে।

-“আমার ইচ্ছে করছে না!”

-“সেকি, কোনো? আমি কিছু শুনবনা, আমি আমার তিস্তা একটা ভালো শাড়ি দিতে চাই ! ওটা পরে আমার সাথে ঠাকুর দেখতে বেরোবেন, বুঝলেন ম্যাডাম?” হাসতে হাসতে বললো আবির।

 তিস্তাকে আনমনা দেখে অবাক হয়ে সে আবার বললো “তোমার কি হয়েছে বলতো? শপিংএ মন নেই তোমার, এমন তো আগে কখনো দেখিনি?”

-“আমাকে সত্যি কিছু গিফ্ট করতে চাও? তাহলে চল আমার সাথে এক জায়গায়!”

আবির আর কথা না বাড়িয়ে বেরিয়ে পড়লো তিস্তার সাথে। উত্তর কলকাতার একটি জীর্ণ বাড়ির বাইরে এসে থামলো তারা। বাইরে বোর্ডে বড় করে লেখা একটি অনাথাশ্রমের নাম। ভিতরে গিয়ে মেট্রনকে বললো তিস্তা, “আমি তিস্তার সাথে দেখা করতে চাই!”

মিনিট দুয়েক পর একটি রোগ, বছর পাঁচেকের শিশু তাদের সামনে এসে দাঁড়ালো। 

“তুমি জানো, আমার নামও তিস্তা?” বিস্মিত শিশুটিকে জানালো তিস্তা। আবিরের দিকে ফিরে বললো “কিগো, তুমি যে বললে তিস্তাকে গিফ্ট দিতে চাও?”

হেসে ফেললো আবিরও। 

অনাথাশ্রমটিতে এমন জনা কুড়ি বাচ্চা থাকত, তাদের সাথে গল্প করে, হৈচৈ করে দিব্বি কাটলো তাদের সন্ধেটা। পরের দিন দুজনের পুজোর পুরো বাজেট মিলিয়ে কুড়িটি বাচ্চার জন্যে জামা কিনতে বেরোলো আবির আর তিস্তা। নতুন জামা পেয়ে উৎসাহিত ছোট্ট তিস্তা দৌড়ে এসে বললো বলে উঠলো, “দিদি, তুমি আর দাদা আমাদের পাড়ার পুজোয় এস কিন্তু। খিচুড়ি ভোগ খেয়ে যাবে। “

সেবছর অষ্টমীর দিনে অঞ্জলি দিলো তারা কুড়িটি নতুন পোশাকে সজ্জিত খুদের সাথে। কচি হাতে যখন শাল পাতার বাটিতে ভোগের খিচুড়ির এনে দিলো তারা, তিস্তার খেয়ে মনে হলো, এই ভোগের স্বাদ যেন আলাদা। 

চারটে পুচকে ছেলের সাথে মার্বেল পাথর নিয়ে ব্যস্ত আবিরের দিকে তাকিয়ে ভাবলো তিস্তা, সত্যি এবারের পুজোটা হলো অন্যবারের থেকে একদম আলাদা। ছোট্ট তিস্তার ফ্রকের বেল্টটা বেঁধে দিতে দিতে মুচকি হাসলো সে, এবছর দুই তিস্তারই পুজো যে কাটলো ঠিক তাদের মনের মতন করে !

(Copyright protected; Image source:Internet)

রেডিওতে শোনা একটি ফোন কোলের অবলম্বনে লেখা এই ছোট গল্প।

Advertisements
Posted in Bengali, short shory

কথা ও সুর

চিরন্তনা সেনগুপ্ত সরকার

“সাদা কালো এই জগতের বইয়ে শুষ্ক লাল গোলাপ….

                   বিস্মৃত কিছু স্মৃতির ওজনে জীর্ণ হয়েছে আজ !

মেঘেরাও আজ ক্লান্ত যে বড়, সিক্ত নয়নে চাই……

                                   একলা আমি ফেলে আসা দিনের মরীচিকার পিছে ধাঁই….”

কবিতাটি পরে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো উত্তরার। কার জন্যে লেখা এই কবিতাটি? 

রাতের খাওয়াদাওয়ার পরে ল্যাপটপ নিয়ে টুকটাক কাজ করাটা উত্তরার রোজকার অভ্যাস। এই সময়টুকু তার একান্ত আপন, যাকে আজকাল  ইংরেজিতে বলে “Me-Time” । আজও ল্যাপটপ খুলে অভ্যাসবশত সে প্রথম পৌঁছে গেছে তার সবচেয়ে প্রিয় ব্লগটিতে যার নাম “কথা ও সুর”। গান-পাগল উত্তরার খুব পছন্দের ওয়েবসাইট এটি। প্রতি সপ্তাহে নতুন নতুন কবিতার আশায় সে অপেক্ষা করে থাকে সারা সপ্তাহ । এবং কবিতাগুলোতে সুর দিয়ে তাদের গানে রূপান্তরিত করাটা যেন এখন নেশায় দাঁড়িয়ে গেছে তার। তার মত অনুরাগী অবশ্য অনেকেই আছেন দেশ বিদেশে যারা তাদের সুরের নোটেশন কবিকে পাঠান। তারপর সেই কবির কথা ও পাঠকদের সুরের ছন্দ মিলেমিশে সৃষ্টি হয় মন-মাতানো কত গান ! সেগুলি গুন্গুন্ করেই উত্তরার কেটে যায় সারা সপ্তাহ । 

কিন্তু আজকের কবিতাটির অন্তরালে যেন এক প্রচ্ছন্ন ব্যাথা তার নিজের পুরোনো কিছু  স্মৃতিকে জাগিয়ে তুললো। গিটার নিয়ে উত্তরা গুন্গুন্ করে গাইতে লাগলো এক নতুন অজানা  সুর। আজ পর্যন্ত কোনদিন সাহস করে তার নোটেশন সে পাঠায়নি কবিকে। যেন আড়ালে থেকে উপভোগ করেছে এই সংগীত সৃষ্টির খেলাকে। ঠিক যেমন করে অনুরাগীদের হাজার প্রচেষ্টা ও প্রশ্নকে উপেক্ষা করেও কবি নিজেকে আড়ালে রেখেছেন, কোনোদিন জানতে দেন নি তার আসল নাম বা পরিচয়। কিন্তু আজকের কবিতাটি একটু  আলাদা। সেই জন্যেই হয়তো কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে নিজের নোটেশন পোস্ট করে দিলো উত্তরা জীবনে প্রথম। 

এত সুরের ভিড়ে হয়তো কবি তার পোস্টটি খেয়ালই করবেন না, মনে মনে আশা করলো উত্তরা। ল্যাপটপ ছেড়ে উঠে গিয়ে জীর্ণ, পুরোনো একটি খাতা বের করলো বইয়ের সেল্ফ থেকে – তার পুরোনো গানের খাতা। পাতা উল্টাতে মাটিতে এসে পড়লো একটি চিঠি, মুক্তোর মতো হাতের লেখায় তাতে লিপিবদ্ধ অভির প্রথম কবিতা, যেটা একদিন কলেজের ক্লাসনোটের ভাজে তার হাতে এসে পৌঁছেছিল । 

                                     “গিটার পেয়েছে নতুনের ছোঁয়া তোর সুরে সুর মিশে।….

                                                        মন যে মেতেছে নতুন ছন্দে; তোর চোখে চোখ রেখে….

                                       এ কোন অজানা দেশে আমি আজ; সবই অচেনা লাগে…..

                                                         হারায়ে না যেন রঙ্গীন স্বপ্ন, অজানা ভয় যে জাগে ! “

হঠাৎ কম্পিউটারের একটা মেকানিক্যাল শব্দে চমকে ওঠলো উত্তরা । ছুটে গিয়ে দেখে কথা ও সুরের কবি স্বয়ং তাকে মেসেজ করেছেন;

“আজকে সকালে কবিতাটি পোস্ট করার পর থেকে অনেক সুরের নোটেশন পেয়েছি। কিন্তু ঠিক যে সুরটা খুজছিলাম সেটা পাচ্ছিলাম না। মনে হচ্ছিল কেউ যেন আমার মনোভাবটি ঠিক করে ধরতে পারছিলো না ! আপনার নোটেশনে এবং সুরে যেন সেই আবেগ, সেই অনুভূতিগুলি খুঁজে পেলাম। ধন্যবাদ। আপনার নামটি লেখেন নি মেসেজে। প্লিজ আপনার পরিচয়টি দেবেন আপনার পোস্টটিতে। আরো কিছু ভালো সুরের অপেক্ষায় রইলাম। “

মেসেজটি পেয়ে অভিমানে চোখে জল চলে এলো উত্তরার । শব্দের আড়ালে, কম্পিউটারের নেপথ্যে বসে থাকা প্রিয় মানুষটিকে প্রথম কবিতা থেকেই ঠিক চিনতে পেরেছিলো উত্তরা, কিন্তু সুর ও ছন্দের আড়ালে, দেড় হাজার অনুরাগীর ভিড়ে সে নিজে যে আজ হারিয়ে গিয়েছে। যে কবিতাগুলোর উপর একদিন  ছিল তার একচ্ছত্র অধিকার, আজ যেন সেই কবিতাগুলো তার একার নয়, সবার! যে মানুষটি এককালে তার নিস্তব্ধতা কে চিনে ফেলতো পারতো, আজ সেই পারলোনা তার সুরটিকে চিনে নিতে!

কিছু উত্তর দিতে মন চাইলো না উত্তরার। ল্যাপটপ অফ করে ঘড়ি দেখলো। রাত তখন প্রায়  ১টা। 

লাইট অফ করে বেডরুমে ঢুকলো সে। ঘুমে অচৈতন্য স্বামীটির দিকে আবছা চোখে চেয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো উত্তরা, “কিছু পরিচয়ের হয়তো কথা ও সুরের আড়ালে লুকিয়ে থাকাটাই ভালো”!

(Copyright protected)                        

Posted in Bengali, short shory

হটাৎ দেখা

 

চিরন্তনা সেনগুপ্ত সরকার

নভেম্বর ২০১১

সেন্ট টমাস চার্চের গলিতে গাড়িটি দাঁড় করিয়ে রিয়ার ভিউ মিররে একবার চুলটা ঠিক করে নিল গৌরব। সন্তুষ্ট হয়ে গাড়িটি লক করে হাটা লাগালো পার্ক স্ট্রীটের দিকে। আজ অবশ্য তার প্রতি শনিবারের মতো গন্তব্য “Someplace Else” নয়, আজ গন্তব্য “Peter Cat” । হাতঘড়িটা একবার দেখে নিল সে, বারোটায় আসার কথা নীলাঞ্জনার। না, তাকে অবশ্য সে চেনেনা, কিন্তু ছবি দেখেছে। মায়ের আবদারে কিছুটা বাধ্য হয়েই আসতে হলো তাকে এই Blind Date এ । এই “Arranged Marriage” বস্তুটিতে একেবারেই বিশ্বাসী নয় সে। এভাবে একদিন চিনে কোনো মানুষকে বিয়ে করে নেয়া যায় নাকি? সবচেয়ে বড় কথা এসবের জন্যে সময়টা তার কোথায়? এত বড় কোম্পানিটাকে একা হাতে চালায় সে। বাবা তো রিটায়ারমেন্ট নিয়ে বাগান করায় মনোনিবেশ করেছেন। মা ও নিজের সোশ্যাল ওয়ার্ক নিয়ে ব্যস্ত। এই মুহূর্তে এত বড় দায়িত্ব নেওয়াটা তার ক্যারিয়ার এবং ব্যবসা, দুটোর জন্যেই যে ক্ষতিকারক, এটা সে কাকে বোঝাবে!

বিরক্ত ভাবে কোটটা একঝটকায়ে ঠিক করে নিল সে। মেয়েদের লেট্ করার অভ্যাস থাকে, সে কিছুক্ষন অপেক্ষা করে কেটে পড়বে, এমনটাই মনে মনে স্থির করলো। কিন্তু কিছুটা এগোতেই রেস্তোরাঁর সামনে একটা চেনা মুখ দেখতে পেল। ছবির থেকে খালি চোখে বেশি সুন্দর দেখতে মেয়েটিকে। মুখশ্রীটা বেশ মিষ্টি যদিও রংটা একটু চাপা। পরনে হালকা তুঁতে রঙের একটা খাদির কুর্তি, ankle -length ডেনিমের লেগিংস, আর গলায় একটা সাদা স্কার্ফ। তাকে চিনতে পেরে এগিয়ে এসে মেয়েটি সানগ্লাসটা খুলে হাত বাড়ালো, “হাই , আমি নীলাঞ্জনা। “

“হ্যালো” বলে হাত মেলালো গৌরব। চোখে হালকা কাজল ছাড়া আর কোনো মেক-আপের ছিটেফোঁটা নেই। “ডেটে আসার এ কেমন সাজ?” মনে মনে ভাবলো গৌরব। তার দুনিয়ার মেয়েরা একেবারেই আলাদা সাজপোশাকে বিশ্বাসী। হাই হীল, ডিসাইনার জামা আর চড়া মেক-আপ দেখে অভ্যস্ত গৌরব প্রথমেই যেন কিছুটা থমকে গেলো নীলাঞ্জনাকে দেখে।

“আমি টেবিল বুক করে রেখেছিলাম। চলুন ভেতরে বসা যাক।” বলে উঠলো নীলাঞ্জনা। “আর হ্যাঁ ,  আমাকে নীল বলে ডাকতে পারেন, সবাই তাই বলে। “

টেবিল বুকটা তো তার করার কথা, সে বেমালুম ভুলেই গেছে। ছেলে হিসাবে ডেটের সমস্ত দায়িত্ব তারই হওয়া উচিত – এমনটাই সে দেখে এসেছে সারাজীবন! কিছুটা হতবম্ব হয়ে নীলের পিছু নিল সে। 

“মিস নীলাঞ্জনা বসু, আমার একটা বুকিং ছিল” নীল ততক্ষন পৌঁছে গাছে রেস্তোরাঁর দোরগোড়ায়। 

“হাঁ ম্যাম আসুন, অনেকদিন পর এলেন।” হাসি মুখে তাকে অভর্থনা জানালো স্বয়ং ম্যানেজার। 

গৌরবের chivalryতে ততক্ষন বাঁধতে শুরু করেছে। এখন ফিরে গেলে খারাপ দেখাবে। তাই বাধ্য হয়ে লাঞ্চ অব্ধি মেয়েটাকে সহ্য করতেই হবে তাকে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে টেবিলে গিয়ে বসলো সে। 

– “আপনার মা বলছিলেন আপনার মিউজিকের খুব নেশা।  আপনার কি নিজের ব্যান্ড আছে?” গৌরব কিছু বলে ওঠার আগেই প্রশ্ন করলো নীল। 

– “ছিল ! ওই টুকটাক গান বাজনা করতাম। এখন কাজের থেকে সময় পাইনা খুব একটা।”

– “আমার তো মনে হয় প্যাশনটাই  প্রফেশন হওয়া উচিত। আমি আপনাদের কলেজ ব্যান্ড এর বেশ কটা ভিডিও দেখলাম Youtube এ । You had been really good as a lead singer.”

কিছুটা বিরক্ত অনুভব করলো গৌরব। অহেতুক জ্ঞান শুনতে তার ভালো লাগেনা। কথা ঘোরাতে বললো “তা আপনি কি করেন ঠিক জানিনা আমি”।

– “I am a photographer. আপাতত Freelance করি। ইচ্ছে আছে wildlife photography করার।”

– “তাই ?” বলে হেসে উঠলো গৌরব।

– “হাসলেন যে?” অবাক হলো নীল। 

– “না, আসলে শহর ছেড়ে জঙ্গলের প্রতি কেন কারো টান থাকবে, আমি ঠিক বুঝি না।” 

ওয়েটার আসাতে কথায় বাধা পড়লো দুজনের। 

– “মিউসিক ছাড়া ফ্রি টাইম পেলে আর কি করেন আপনি?” নীল জিজ্ঞাসা করলো অর্ডার দেয়ার পর। 

– “লং ড্রাইভ, পার্টি, নাহলে বন্ধুদের সাথে আড্ডা বা মুভি। এই। যদিও সময় আমি খুব একটা পাইনা। তবে প্রত্যেক শনিবার বন্ধুরা Someplace Else এ আসি আমরা। আপনি ?”

– “একেবারেই আলাদা” হেসে উঠলো নীল, “গল্পের বই পড়ি নাহলে রান্না করি। আমার কুকিং করতে খুব ভালো লাগে। দেশ বিদেশের রান্না। একটা রান্নার ব্লগও আছে আমার। ফটোগ্রাফির নেশাটা বাদ দিলে আদতে আমি কিন্তু খুব ঘরকুনো।”

গৌরব বুঝলো কোনো মিলই নেই তাদের মধ্যে, তাও জানতে চাইলো,  “গান শোনেননা ? কিরকম গান ভালোবাসেন ?”

– “Mostly রবীন্দ্রসংগীত , পুরোনো দিনের গান, ক্লাসিক্স , এসবই ভালো লাগে। আপনি বই পড়েন না?”

– “না, একেবারেই না। অনেক সময় আর ধৈর্য লাগে। আমার তা নেই। “

খেতে খেতে প্রায়  আধঘন্টা চললো কিছু না কিছু মিল খুঁজে বের করার ব্যর্থ প্রয়াস। আপব্রিনগিং, ফ্যামিলি, আশা – প্রত্যাশা, পছন্দ-অপছন্দ, সবই যেন আলাদা তাদের! 

বাইরে এসে কিছুটা ক্ষুন্ন হয়েই গৌরব বললো, “এই বিল ৫০-৫০ করার ব্যাপারটা আমার জীবনে প্রথম।”

তার রাগের কারণ আন্দাজ করতে  না পেরে খুব সহজ ভাবেই বলে উঠলো নীল “তাই? আমরা বন্ধুরা তো সবসময় করি। আচ্ছা আমি অক্সফোর্ডে যাবো, আপনি আসবেন ?”

“No  thanks, আপনি যান।” এড়িয়ে গেল গৌরব।

হাত বাড়িয়ে নীল বললো “আজ তাহলে আসি। খুব ভালো লাগলো কথা বলে। “

“বাই” সংক্ষেপে উত্তর দিলো গৌরব। বানানো কথা সে বলতে পারেনা। যেটুকু মন থেকে বের হয় তাই বলে । রাস্তা পার করে নীল রওনা দিলো তার পছন্দের বুকস্টোরের উদেশ্যে। ছাড়া পেয়ে গৌরব ও ছুটলো তার গাড়ির দিকে। এভাবে তার  সময় নষ্ট করানোর জন্যে আজ রাতে মায়ের সাথে কথা বলতেই হবে তাকে, মনে মনে স্থির করলো সে। গাড়ির ড্যাশবোর্ডের উপর পরে থাকা নীলের বায়ো-ডাটা আর ছবিটা চোখে পড়লো তার, হাতে তুলে আরেকবার দেখলো ছবিটা। Wildlife ফটোগ্রাফার হবে, আজব মেয়ে বটে! হেসে ফেললো সে। ছবিটা যত্ন সহকারে খামে ভরে রাখলো গৌরব, আজ রাতে মা কে ফেরত দিয়ে দিতে হবে যে !

*****

ডিসেম্বর ২০১৬

ইন্দিরা গান্ধী ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। লাউঞ্জের কোনায় কানে হেডফোনটা গুঁজে বসলো গৌরব। বিজনেস মিটিং থেকে সোজা চলে এসেছে সে এয়ারপোর্টে। ওদিকে কুয়াশার জন্যে প্লেন লেট্। এখনো অনেকটা সময়  কাটাতে হবে তাকে এয়ারপোর্টে। গান শুনতে শুনতে এদিক ওদিক চেয়ে দেখছে সে। অচেনা মানুষের সমুদ্র। সবাই যে যার গন্তব্যে পৌঁছনোর অপেক্ষায়। হটাৎ সেই অচেনা  ভিড়ে একটা চেনা মুখ চোখে পড়লো তার। আরে, কি যেন নাম ছিল মেয়েটার? হ্যাঁ, নীলাঞ্জনা। 

নীল রঙের জিন্স , তার উপর গোলাপি টপ, পায়ে স্নিকার, ও পাশে এক বিশাল ব্যাকপ্যাক নিয়ে অল্প দূরে একটা ফটোগ্রাফির বইয়ে নিমগ্ন নীল। গৌরব ঠিক তার সামনে এসে দাঁড়ালো।

-“হাই , চিনতে পারছেন?”

মুখ তুলে তাকালো নীল। “আরে, গৌরববাবু? বসুন বসুন। ভাবিনি আপনার সাথে আবার কোনোদিন দেখা হবে। “

পাঁচ বছর আগের সাক্ষাৎটা মনে পরে গেল গৌরবের। পাশের চেয়ারে বসে বললো “কোথায় যাচ্ছেন?”

-“জব্বলপুর। ওখান থেকে বান্ধবগড়। দিল্লীতে এসেছিলাম একটা ফটোগ্রাফির কোর্স করতে। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের একটি প্রজেক্টে যাচ্ছি। আপনি ?”

-“কলকাতা ফিরছি। একটা মিটিং এর জন্যে এসেছিলাম। আপনার বাড়িতে সবাই ভালো তো?”

টুকটাক কথা এগোতে লাগলো এভাবে। হাতঘড়িটা দেখে গৌরব বললো “আপনারও তো ফ্লাইট লেট্। চলুন না একটু কফি খাওয়া যাক। ” নীলকে ইতস্তত করতে দেখে সে হেসে বললো “৫০-৫০ হবে, আমার মনে আছে। “

হেসে উঠলো নীলও। ক্যাফেটেরিয়ায় পৌঁছে অর্ডার করে এক কোনায় বসলো তারা।

“তারপর, বিয়ে করেছেন?” সারাসরি জিজ্ঞাসা করলো গৌরব।

“আমার মতো বন্যপ্রাণীকে বিয়ে করার লোক খুঁজে পাওয়া দায়ে। এই দেখুন না, আপনিও তো পালিয়ে গিয়েছিলেন।” হেসে উত্তর দিলো সে। 

গৌরব যখন কি উত্তর দেবে ভেবে পাচ্ছে না, তখন পাল্টা প্রশ্ন করলো নীল , “আপনি করেননি বিয়ে?”

-“করেছিলাম। তিনবছর আগে। এক বছর আগে ডিভোর্স হয়ে গেছে । “

-“ওহ, I am sorry !”

কথা হারানোর পালা এবার নীলের। কিছুক্ষন দুজনই নিঃশব্দে বসে রইলো। কিছুক্ষন পরে খুব ভয় ভয় প্রশ্ন করলো নীল “কেন জানতে পারি, if you don’t mind !”

-“নিজেও ঠিক জানিনা আমি” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো গৌরব। “আমার বাবার বিজনেস পার্টনারের মেয়ে। সব দিক থেকেই আমার জন্যে মানানসই ছিল।  আমিও তাই ভেবেছিলাম। কিন্তু সম্পর্কটাতে কি যেন একটা মিসিং ছিল, নিজেও ঠিক জানিনা। অনেক চেষ্টা করেছিলাম সম্পর্কটাকে বাঁচাতে।  আসলে কি জানেন,শুধু মিল থাকলেই যে দুটো মানুষ পুরোপুরি compatible হবে, তার হয়তো কোনো মানে নেই। মাঝে মাঝে একটা এক্সট্রা কিছুর দরকার পরে…..যেমন…..কি যে বলি…..কি ভাবে যে বোঝাই আপনাকে…..”

-“যেমন একটু এডভেঞ্চার।” বলে উঠলো নীল। 

অবাক হয়ে গেল  গৌরব। “হ্যাঁ, হয়তো একটু এডভেঞ্চারই “! 

-“এমনি এমনি তো বলে না Opposites attract । একটু ক্লিশে শোনালো জানি। কিন্তু এটাই সত্যি।” বলে উঠলো নীল। 

-“আচ্ছা, একটা কথা জানতে ইচ্ছে করে” জিজ্ঞাসা করলো গৌরব। “আপনি ঐদিন বলেছিলেন যে আপনার আমার সাথে কথা বলে ভালো লেগেছিলো, সেটা কি সত্যি না নিছকই ভদ্রতা ছিল?”

-“মিথ্যা বলতে আমি খুব একটা পারিনা, গৌরববাবু। আপনার আর আমার জগৎটা একদমই আলাদা। সেইজন্যেই অনেক কিছু জানার এবং শেখার ছিল আমাদের পরস্পরের থেকে। হয়তো বিজনেসের উপর নতুন ঝোক চলে আসতো আমার, বা কুকিংএর নেশা লেগে যেত আপনার। বা হয়তো আপনার ব্যান্ডের গানের একজন নতুন শ্রোতা পেয়ে যেতেন আপনি, আর আমি আপনার মধ্যে আমার ফটোগ্রাফির একজন ক্রিটিক পেতাম ! আপনি  অবশ্য সেই সুযোগটা আর দিলেন কই। “

কত সরলভাবে এই মেয়েটা এই গুরুগম্ভীর কথাগুলো ব্যক্ত করে দিলো। সত্যি হয়তো নতুন করে জীবনকে দেখার সুযোগ পেতো গৌরব নীলের সাথে থেকে। চিরাচরিত গতানুগতিক জীবনের হয়তো একটা আলাদা স্বাদ পেতো। হয়তো এই কারনেই মায়ের এত পছন্দ হয়েছিল নীলকে। মাথা নিচু করে ভাবতে লাগলো গৌরব।

কফিটা শেষ করে উঠে দাঁড়ালো নীল। 

-“গৌরববাবু, এখনো সময় আছে। জব্বলপুরের ফ্লাইট কিন্তু এখনো ভর্তি হয়নি। একটু এক্সপ্লোর করে দেখবেন নাকি আমার জগৎটাকে?”

চিরকাল প্ল্যানমাফিক কাজ করা গৌরবের মাথায় হঠাৎ যেন কি একটা পাগলামীর পোকা নড়ে উঠলো। অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা ইন্ডিগোর ফ্লাইট আটটেনডেন্টের সাথে কথা বলতে দৌড়ালো সে। বেশ কিছু ফর্মালিটি শেষ করে পকেট থেকে ফোনটাকে বের করে ডায়াল করলো বাড়ির নম্বর। 

সে যে আজ কলকাতা পৌঁছাবে না, তা তো জানিয়ে দিতে হবে তাদের! 

(Picture source : Internet)

Posted in Bengali, short shory

পুতুল বিভ্রাট

চিরন্তনা সেনগুপ্ত সরকার

গড়িয়াহাট থেকে অল্প এগোলেই চোখে পরবে একটি সুদৃশ্য, দ্বিতল বাড়ি। বাড়িটির উপরতলায় বিরক্ত পাপিয়া দেবী রান্নার কাজে ব্যস্ত। সবিতাটা আবার ডুব মেরেছে। পাশের ঘরে তার স্বামী নির্বিকার চিত্তে সকালের কাগজটা এই  নিয়ে ন’নম্বরবার  উল্টে পাল্টে দেখছেন, বৌয়ের খিটখিট শোনার থেকে এই অকাজটা করাটা ঢের  বেশি শ্রেয় মনে হয়েছে তার। বাড়ির নিচতলা এই প্রবীণ দম্পতি  ভাড়া দিয়েছেন তিনটি তরুণীকে। কলকাতার বিভিন্ন কলেজের ছাত্রী এরা। বাড়ি সকলেরই দূরে। একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর পাপিয়া দেবীরও তাদের সাথে হৈহুল্লোড় করে সময়টা ভালো কাটে, আবার একটু উপার্জনও হয়ে যায়।  

 

নিচের ঘরে বিছানার উপর একটি গল্পের বই নিয়ে উপুড় হয়ে পরে আছে ঝিলিক। রবিবার সকাল সকাল মৌ আর সৃজা গেছে টিউশন পড়তে।  নিচতলায় সে এখন একাই।  সারাদিন তো কলেজ, বন্ধুবান্ধব  আর পড়াশোনার ফাঁকে গল্পের বই পড়ার সময়ই হয়ে ওঠে না তার। ঘড়ির দিকে তাকালো ঝিলিক। দশটা বাজে। মৌ আর সৃজার ফেরার সময় হয়ে এলো প্রায়। আজ বিকেলে তিন বন্ধু ঘুরতে বেরোবে প্ল্যান করেছে। কিন্তু কোথায় যাওয়া হবে এখনো যে কিছুই ঠিক হলো না! 

 

হটাৎ কলিং বেলের আওয়াজ হলো। দৌড়ে গিয়ে দরজাটা খুলে দিলো ঝিলিক। সৃজা ও মৌ একসাথে বলে উঠলো “ঝিলিক, একটা খবর আছে !”  তাদের বলার ভঙ্গি দেখে ঝিলিকের অনেকটা জেম্স বন্ড সিনেমার স্পাইদের কথা মনে পরে গেল।

 

“কি খবর? বল বল !” আর কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে নিচু গলায় বললো ঝিলিক।

 

“প্যান্টালুনসে আজ  ফ্ল্যাট ৫০% ছাড় দিচ্ছে ! যে কোনো জিনিসে !” প্রচন্ড উৎসাহের সাথে বলে উঠলো সৃজা। 

 

খবরটা শুনে ঝিলিকের মনটা খারাপ হয়ে গেল, “ধুস, আমি ভাবলাম কি না কি খবর দিবি !”

 

“তুই এবার ডিটেক্টিভ গল্প পড়াটা কমা তো। তুই কি ভেবেছিলি ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের গোপন তথ্য নিয়ে ফিরেছি? ” মৌ বলে উঠলো হাসতে হাসতে। 

 

“আমরা আজ বিকেলে শপিং এই যাবো, বুঝলি ঝিলিক?” সৃজার এই অতি-উৎসাহের কারণ অবশ্য ঝিলিকের জানা । সদ্য এক পাতানো দাদার হাতে রাখি পরিয়ে বেশ কিছু টাকা উপার্জন হয়েছে তার। সেটা খরচ না করা পর্যন্ত শান্তি হচ্ছে না সৃজার !

 

“ঠিক হ্যায়, তাই চল।” চিন্তিত মুখে বললো ঝিলিক। হাতে কিছু টাকা থাকা সত্ত্বেও আদতে কিপটে মেয়েটার শপিং এর নাম শুনলেই বুক ধড়াস করে ওঠে। মনে মনে ঠিক করলো, বেশি টাকা সঙ্গে নেবে না, পাছে লোভ সামলাতে না পেরে কিছু কিনে ফেলে!

 

বিকেলে তিন জন বান্ধবী সেজেগুজে বেরোলো গড়িয়াহাটের দিকে। মৌয়ের খুব মাথা গরম, ঘামে তার সাজ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ! খিটখিট করতে করতে যাচ্ছে সে। ঝিলিক মনে মনে টাকার হিসাব করতে করতে যাচ্ছে। অঙ্কে নিতান্ত কাঁচা মেয়েটি অবশ্য ডিসকাউন্ট হিসাব করার সময় আর্যভট্টে পরিণত হয়। সৃজার একমাত্র যেন বাঁধ ভাঙা উচ্ছাস। কি কি কিনবে তার ফিরিস্তি দিতে দিতে যাচ্ছে সে তার দুই বন্ধুকে। 

 

একে রবিবার, তার উপর সেল, প্যান্টালুনসে পৌঁছে দেখা গেল পা রাখার পর্যন্ত জায়গায় নেই। এ যেন রথের মেলার ভীড়। কিন্তু এই নাছরবান্দা তিন কন্যে পিছপা হতে শেখেনি কোনোদিন। “মাভৈ” বলে ভীড় ঠেলে ঢোকার প্রচেষ্টায় মনোনিবেশ করলো তারা। এসি দোকানটিতে প্রবেশ করার পর মৌয়ের মাথাটা যেন কিছুটা হলেও শীতল হলো। ততক্ষনে অবশ্য তার টেম্পোরারি স্ট্রেইটেন করা চুলের বারোটা বেজে গেছে। আরেকচোট রাগারাগির ভয়ে সেদিকে আর আলোকপাত করলো না সৃজা আর ঝিলিক।  পাছে আবার রণচন্ডী মূর্তি ধারণ করে মৌ। ভীড় ঠেলে মেয়েদের সেকশন এ যতক্ষনে এসে পৌছালো তারা, মনে হলো যেন মহাভারতের যুদ্ধ জয় করেছে । ভীড়ের মধ্যে মারামারি করে যে যার মতো জামাকাপড় দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো তিনবন্ধু । 

 

১০০০ টাকায় ৪ খানা টি-শার্ট পাওয়া যাচ্ছে দেখে ঐদিকে দৌড়ালো ঝিলিক। যাক, এতে অনেকদিনের ব্যবস্থা হয়ে গেল, আবার সাশ্রয়ও হলো।  ট্রায়াল রুমের দিক থেকে শুনতে পেলো মৌয়ের আওয়াজ , “কেন, ৫টা জামা কেনার বেলায় তো না করেন না, তাহলে ৫টা জামা নিয়ে ট্রায়াল রুমে ঢুকলে কি দোষ, জানতে পারি? “

 

ট্রায়াল রুমের সামনের মেয়েটি আমতা আমতা করে কি উত্তর দিচ্ছিলো কানে এলোনা ঝিলিকের। জামা ট্রায়াল দেয়াটাই তার কাছে একটা বিভীষিকা, সে ৩তে হোক কি ৫টা। সৃজা কে দেখা যাচ্ছে না কেন কোথাও? খোঁজাখুঁজি করতে বেরোলে সে। মিনিট ১৫ পরে ক্যাশ কাউন্টারের দিকে যখন পা বাড়ালো মৌ আর ঝিলিক তখনও সৃজা বেপাত্তা । ফোন ও ধরছে না। ক্যাশ কাউন্টারে পৌঁছে দেখলো বিশাল ভীড়, মনে হল যেন সারা কলকাতা এতদিন নির্বস্ত্র ছিল, আজই সবার একসাথে জামার দরকার পড়েছে!

 

জনসমুদ্রের মাঝে হটাৎ দেখা গেল লাইনে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক বিশালাকায় সোনালী রঙের টেডি বেয়ার।  “বিচিত্র সব শখ লোকজনের” মনে মনে ভাবলো ঝিলিক। 

 

“রিডিকুলাস, সৃজা গেল টা কোথায়?” ভীড় ও ট্রায়ালের ধকলের পর পাখির বাসায় পরিণত চুল সামলাতে সামলাতে বলে উঠলো মৌ। 

 

“এই তো আমি ” টেডি বেয়ার বলে উঠলো সৃজার কণ্ঠে। প্রায় ৫ ফুট লম্বা পুতুলটির পিছন থেকে উঁকি মারতে দেখা গেল সৃজাকে। 

 

“কি সস্তায় পেলাম রে। পাক্কা ৬০% অফ।”

 

একি কান্ড ! চক্ষু ছানাবড়া  দুজনের।  সৃজা এসেছিলো তো কটা জামা কিনতে, টেডি বেয়ার কোথায় পেলো ? কিন্তু সৃজার চোখে মুখে আনন্দের উচ্ছাস দেখে আর কিছু বললো না মৌ আর ঝিলিক। 

 

“আমার কতদিনের শখ আজ পূর্ণ হবে !” আবেগ প্রবন হয়ে বলে উঠলো সে। 

 

আধ ঘন্টা যুদ্ধের পর বিধ্বস্ত অবস্তায় দোকান থেকে বেরোলো মৌ আর ঝিলিক। পিছন পিছন, অনেকটা শিবঠাকুর যেভাবে পার্বতী কে কাঁধে তুলেছিলেন, সে ভাবে পুতুলটিকে নিয়ে হাপাতে হাপাতে  বেরোল সৃজা।

 

“সি সি ডি যাবি? আই নিড এ কাপ অফ কফি?” মৌ বলে উঠলো।

 

“হ্যাঁ, চল চল। খুব ক্ষিদে ও পেয়েছে। ” সায় দিলো টেডি বেয়ার আবৃত সৃজা।

 

প্রমাদ গুনলো ঝিলিক। আবার কত টাকার ধাক্কা কে জানে ।

 

“বাইরে চা খেলে হয় না?” ভয় ভয় জিজ্ঞাসা করলো সে।  

 

“প্রশ্নই উঠছে না ” বলে গটগট করে হাটা দিলো মৌ সি সি ডির উদ্ধেশ্যে।

 

কিছুটা বগলদাবা করে, কিছুটা ছ্যাঁচড়াতে ছ্যাঁচড়াতে, পাঁজা কোলা করে পুতুল নিয়ে পিছু নিল সৃজা সি সি ডির দিকে। কিন্তু সেখানে পৌঁছে আরেক ধাক্কা!

 

“সরি ম্যাডাম,  ভীড়ে অত বড় সফ্ট টয় নিয়ে ঢুকলে অন্য কাস্টমারদের অসুবিধে হবে!” কাচুমাচু মুখ করে বললো সি সি ডির বাইরে বসে থাকা নীল জামা পড়া গার্ডটি। যাক, ঝিলিকের প্রার্থনা ভগবান শুনেছে তাহলে। আনন্দে মনে মনে একটা পেন্নাম ঠুকলো সে। অন্তত ১০০ টাকা তো বাচঁলই !

 

অগত্যা কি করা, রাস্তার ধারে  ১০টাকার চা খেয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়ালো সবাই। বাড়িটি অবশ্য হাটা পথ। কিন্তু কিছুটা যেতেই পিছন থেকে শোনা গেল সৃজার চেঁচামেচি “একটু হেল্প কর না আমাকে!” । 

“কেনার সময় মনে ছিল না?” বিরক্ত ভাবে ধমক দিয়ে উঠলো মৌ। 

 

দশ মিনিট পর যখন নিজেদের বাড়ির গেটের সামনে পৌছালো তারা তখন পুতুলটির মাথা সৃজার কাঁধে, কোমর মৌয়ের কাঁধে আর পা দুটি ঝিলিকের কাঁধে। এই বিরল দৃশ্য দেখতে অবশ্য রাস্তার অনেকেই দাঁড়িয়ে পড়েছিল। “পরের দিনের কাগজে ছবি বেরোলে খুব অবাক হবো না” মনে মনে ভাবলো ঝিলিক।

 

ঘরে ঢুকে সৃজার বেড এ পুতুল ফেলে হাপাতে হাপাতে যে যার  ঘরে পালালো ঝিলিক আর মৌ। সৃজার উচ্ছাস অবশ্য এক বিন্দুও কমে নি। হাত ধরে পাপিয়া দেবীকে টেনে নিয়ে আসলো তার  “গোল্ডি” কে  দেখানোর জন্যে । হ্যাঁ, রাস্তায় পুতুল বয়ে আনতে  আনতে এই নামটাই স্থির করে ফেলেছিল সে। 

 

“হায় ভগবান! এটা কি কিনে আনলি তুই?” পাপিয়া দেবীর হাহুতাশে গাল ফুললো সৃজার। 

 

“উফ কাকিমা, তুমি কিছু বোঝো না। কত কমে পেলাম বল তো! আর আমার কত ছোটবেলার শখ একটা বড় টেডি কেনার। এটাকে আমি জড়িয়ে ধরে ঘুমাবো রোজ রাতে ” 

 

বেচারির আনন্দ দেখে আর কথা বাড়ালেন না পাপিয়া দেবী। “আচ্ছা, খেতে চলে আয়ে সবাই এবার। ডিনার রেডি। “

 

ডিনারের পর শুরু হলো সৃজার ফোন পর্ব। জনে জনে ফোন করে পুতুলটির আয়তন, দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং দামের ফিরিস্তি দিতে শুরু করলে সৃজা। হোয়াটস্যাপ এ ছবি চলে গেল কন্যাকুমারী থেকে কাশ্মীর অবধি সবার কাছে।  ফেসবুকে লেগে গেল স্টেটাস “ফিলিং এক্সসাইটেড। ” 

 

বিছানার উপর টানটান করে শুয়িয়ে দিলো সে গোল্ডিকে। “আজ যা ভালো ঘুম হবে না রে…দেখিস। ” চেঁচিয়ে বললো মৌ আর ঝিলিককে।  কেউ বিশেষ সারা দিলো না আর। পুতুলটিকে জড়িয়ে ধরে ঘুম দিলো সৃজা। ঠোঁটের কোনায় লেগে থাকলো একটা তৃপ্তির হাসি।

 

রাত বাড়তে লাগলো, সাথে বাড়তে লাগলো অস্বস্থি।  ছোট সিঙ্গেল বেড, তার উপর গোল্ডি, তার উপর সৃজা। ঘাড়ে ব্যাথা বাড়তে লাগলো ক্রমশ। মাঝে রাতে উঠে কাতর কণ্ঠে ডেকে উঠলো সৃজা “ঝিলিক, মৌ, তোরা কি কেউ পুতুলটাকে নিয়ে শুতে চাস রে?”

 

আতঙ্কিত ঝিলিক আর মৌ টু শব্দটুকু করলো না। অনেক রাতে একটা ধপাস শব্ধে ঘুম ভাঙলো  ঝিলিক আর মৌয়ের । দৌড়ে গিয়ে সৃজার ঘরে ঢুকে দেখলো ঠোঁট উল্টে মাটিতে বসে রয়েছে সৃজা, বিছানায় আরাম করে হাত পা ছড়িয়ে ঘুমোচ্ছে গোল্ডি । 

 

“এবাবা! পরে গেলি?” খিল খিল করে হেসে উঠলো মৌ। হাসিতে ফেটে পড়লো ঝিলিক ও।  রাগে গজগজ করতে করতে বিছানার উঠে এক লাথি মেরে আদরের গোল্ডিকে ধরাশায়ী করলো তার মা। হায়রে ছেলেবেলার শখ!  এত অল্পেই যে শখপূরণের এই পরিণতি হবে কেউ ভাবতে পারেনি। গোল্ডি নির্বিকার চিত্তে বাকি রাতটা মাটিতে শুয়েই কাটিয়ে দিলো। তার মা বা মাসিরা কেউই যেন আর তার দায়িত্ব নিতে চাইলো না। 

 

পরের দিন সারাটা দিন পুতুলটি পরে রইলো মাটিতে । ছোট্ট ঘরে সৃজার চলাফেরা করা, বই রাখা, কাজের মাসির ঘর মোছা দায়ে হয়ে উঠলো । এমনকি বিরক্ত হয়ে সৃজার ঘরে আসা বন্ধ করলো দুই বন্ধু ও। আগামী দিন সকালে যখন ঘুম ভাঙলো ঝিলিকের, শোনা গেল সৃজা তার মা কে ফোন করে বলছে আর এক মুহূর্ত সে এই পুতুলটিকে ঘরে দেখতে চায়না। তারা যেন এসে গোল্ডি কে বাড়ি নিয়ে যায়। নিরুপায়, ব্যতিব্যস্ত বাবা-মা সেইদিন সন্ধ্যায় সুদূর উত্তরপাড়া থেকে গাড়ি ভাড়া করে এলেন, মেয়েকে পুতুল বিভ্রাট থেকে রক্ষা করতে। 

 

বিরক্ত বাবা মা আর এক কালের আদরের গোল্ডি কে বিদায় জানিয়ে বিছানায় এসে বসলো  সৃজা। 

 

“শখ মিটেছে?” হাসতে হাসতে জিজ্ঞাসা করলো ঝিলিক।

 

“জীবনে আর যাই করিস না কেন, ঘুমের সাথে কম্প্রোমাইস করবি না কখনো। বুঝলি ? এবার লাইট  টা অফ করে দিয়ে শুতে যা !” 

 

গম্ভীর ভাবে মৌ আর ঝিলিককে “মেসেজে অফ দা ডে” টা শুনিয়ে টান টান হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো সৃজা….এক গভীর, অবিঘ্নিত এবং  আরাম-দায়ক ঘুমের প্রত্যাশায়!

 
 
(Image source : Internet)
Posted in Bengali, short shory

ব্যতিক্রমী

চিরন্তনা সেনগুপ্ত সরকার

মুম্বাইয়ের ছত্রপতি শিবাজী ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের ভীড় ঠেলে প্রিপেইড ট্যাক্সির লাইনে এসে দাঁড়ালো গুঞ্জা। এক হাতে একটা ছোট্ট ট্রলি, অন্য হাতে একটা বিশাল হ্যান্ডব্যাগ।পরনে একটা ডেনিমের শর্টস আর সাদা শার্ট-   ছোট থেকেই পোশাক-আশাক, হাব-ভাব সবেতেই যেন একটা স্বেচ্ছাচারিতা প্রকাশ পায় তার। মোবাইলে সময় দেখে নিলো সে। ফ্লাইট লেট করেছে দু’ঘন্টা। হাতে তার সময় বড়ই অল্প। ঠিক দু’ঘন্টা পরে একটা ইন্টারভিউ আছে তার ।  এই বছরের সর্বাধিক বিক্রিত উপন্যাস “ব্যতিক্রমী”র লেখক এর সাথে। উপন্যাসটি প্রথমে লেখা হয় বাংলাতেই। কিন্তু পরবর্তীতে ইংরেজি সহ বিভিন্ন ভাষায় তার অনুবাদ করা হয়। শোনা যাচ্ছে কোনো বিশাল চলচ্চিত্র নির্মাতা নাকি এটার উপর একটা সিনেমাও বানাচ্ছেন । এই খবর কানে আসা মাত্র তার ম্যাগাজিনের এডিটর তাকে মুম্বাই যাওয়ার আদেশ দিয়েছেন, ভদ্রলোকের ইন্টারভিউ নাকি চাই-ই-চাই। সচরাচর ইন্টারভিউ দেন না উনি। আজ পর্যন্ত বহু বড় বড় পত্রিকা বহু চেষ্টা করেও  উনার সাথে যোগাযোগ করতে পারেনি। গুঞ্জা বহু কষ্টে তার মোবাইল নম্বর জোগাড় করে একটা মেসেজ করে। কোনো অজানা কারণে গুঞ্জাকে উনি হটাৎ ইন্টারভিউ দিতে রাজি হলেন ! ব্যাস, পরের দিনের প্রথম ফ্লাইট ধরেই গুঞ্জা এখন মুম্বাইয়ে।

 

দেশের এক প্রথম শ্রেণীর লাইফস্টাইল ম্যাগাজিনে কাজ করে গুঞ্জা। কি করে যে সাংবাদিক হতে গিয়ে এই পেজ থ্রীর জগতে এসে পড়লো সে, তা তার নিজেরই  বোধগম্য হয়না। এই ঝা চকচকে জগতের কিছুই তার খুব একটা ভালো লাগেনা। যেমন এই বইটি। একটি ব্যতিক্রমী, দুঃসাহসী মেয়েকে নিয়ে নাকি লেখা একটি হালকা উপন্যাস । গল্পটি পরে দেখার প্রয়োজন অনুভব করেনি সে। ঐতো গতানুগতিক একটি প্রেমের গল্প হবে। কি করে যে তা দেশ মাতাতে পারে তা সে বুঝে উঠতেই পারেনি । এসব গল্প তার ভালো লাগেনা। সে পছন্দ করে নন-ফিক্শন এবং জীবনী পড়তে। প্রেমের গল্প পরে সময় নষ্ট করার ইচ্ছে তার নেই। কিন্তু সে শুনেছে এই লেখক ভদ্রলোক নাকি খুব কড়া মেজাজের মানুষ। বয়েস অল্পই, কিন্তু হাবভাবে নাকি একটা ঔদ্ধত্ব আছে যেটা অনেকেরই ভালো লাগেনি। তার উপর আজ হবে দেরি! এখনো ট্যাক্সিই পেলো না, তার পর হোটেলে গিয়ে চেঞ্জ করে কখন যে ইন্টারভিউতে  পৌঁছাতে পারবে ঠিক নেই । কপালে যে কি আছে কে জানে ! একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো গুঞ্জা।

 

ঘন্টা দুয়েক পরে তার হোটেল থেকে একটা ট্যাক্সিতে সে যখন ছুটে চলেছে মেরিন ড্রাইভ ধরে তাজ মুম্বাইয়ের  উদ্দেশ্যে, পাশে প্রসারিত বিশাল আরব সাগরের কলরব তার কান অবধি যেন পৌঁছালোই না। সমুদ্র পাগল সেই ছোটবেলার গুঞ্জা এখন হারিয়ে গেছে বহুযুগ। পাশেরবাড়ির ঋজুদার পরিবারের  সাথে যখন সেই ছোটবেলায় সপরিবারে প্রথম দীঘা ঘুরতে গিয়েছিল সে, কি অবাক উৎসাহ অনুভব করেছিল সেই বিপুল জলরাশি দেখে। এই বয়েসে এসে অবশ্য সেইসব তার স্মৃতি থেকে  বিলীন হয়ে যেতে বসেছে। সমুদ্রর শোভা উপভোগ করার অবকাশ এখন তার নেই। প্রাত্যহিক জীবনের ঘোড়দৌড়ে হারিয়ে গেছে সেই উচ্ছাস, সেই পুরোনো বাড়ির দালান আর সেই ঋজুদা। সপরিবারে এখন দীর্ঘ দশ বছর বাবার চাকরি সূত্রে তারা কলকাতা ছাড়া । গুঞ্জা অবশ্য একাই  থাকে দিল্লীতে, নিজের কাজের জন্যে। ট্যাক্সি নিয়ে ছুটে চলা এই নতুন গুঞ্জা এখন কেবল একটাই প্রার্থনা করছে, লেখক যেন নিজে একটু দেরি করে পৌঁছায়!  

তাজ হোটেলের  রিসেপশনে পৌঁছে খোঁজ করতে জানতে পারলো যে শ্রী অপূর্ব রায় এক ঘন্টা ধরে লাউঞ্জে তার অপেক্ষায় বসে আছেন। হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেল গুঞ্জার।  চকচকে ফ্লোরের উপর হাই হীলের শব্ধ উপেক্ষা করে সে ছুটলো লাউঞ্জের দিকে। হাতে ম্যাগাজিন ও সামনে এক কাপ গরম কফি নিয়ে সোফায় অন্যমনস্ক হয়ে বসে রয়েছেন এক ভদ্রলোক। ইনি লেখক অপূর্ব রায়। বয়েস তিরিশের ঘরে। পরনে একটা জিন্স ও সাদা শার্ট। হাতে দামী একটি ঘড়ি ব্যাতিত সাজের বিশেষ আড়ম্বর নেই, কিন্তু তবুও যেন রয়েছে  এক দারুন ব্যক্তিত্বের ছাপ।

 

কাছে এগিয়ে গিয়ে বিনীত ভাবে বললো গুঞ্জা, ” সরি মিঃ রায়, আপনাকে বোধহয় অনেকক্ষন অপেক্ষা করতে হলো।  আসলে আমার ফ্লাইটটা —“

 

তার কথা মাঝপথে থামিয়েই গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন অপূর্ব, “আপনাদের মতো এত বড় ম্যাগাজিনের কাছে আরেকটু বেশি প্রফেশনালিজম আশা করেছিলাম। যাক, বসুন।”

 

থতমত খেয়ে সামনের সোফায় বসলো গুঞ্জা। ব্যাগ থেকে নোটস বের করতে যাবে তখনি বলে উঠলেন অপুর্ব “আপনার জন্যে চা – কফি কিছু আনাবো?”

 

“না, ঠিক আছে।থ্যাংক ইউ !” উত্তর দিলো গুঞ্জা। মুখোমুখি বসে এক ঝলক ভালো করে দেখে নিলো ভদ্রলোকটিকে। একটি বুকলঞ্চে তার ছবি আগে সে দেখেছিল। কিন্তু ছবির তুলনায় সামনে অনেক বেশি হ্যান্ডসম  মনে হলো তাকে। খুব পরিচিত লাগলো চোখ দুটি। কিন্তু বহু কষ্ট করেও মনে করতে পারলো না কোথায় দেখেছে এই চোখদুটি আগে। হয়তো ছবিতেই।  ইনি তো এখন প্রায় সেলিব্রিটি, পরিচিত লাগাটা খুব একটা আশ্চর্যের  নয়!

 

ওয়েটারকে ডেকে গুঞ্জার জন্যে একটা কফি অর্ডার করে দিলেন তিনি।  গুঞ্জার একটু রাগই হলো, সে তো কফি খেতে চায়নি। কথা না বাড়িয়ে  তার প্রথম প্রশ্ন করে বসলো গুঞ্জা।

 

— “আপনি কি আশা করেছিলেন এত নাম করবে আপনার প্রথম বইটি ?”

কফি কাপ নামিয়ে অল্প হেসে উত্তর দিলেন লেখক – “আপনি বুঝি সেই সব মানুষের মধ্যে একজন যারা কাজ করেন কিছু পাওয়ার আশায় ? আমি একটু আলাদা, আমি লিখেছি কারণ লেখাটা আমার প্যাশন। ব্যাস, প্রতিদানে কিছু পাওয়ার আশা আমি করিনি ” 

 

গুঞ্জা মনে মনে রেগে উঠলো। এভাবে তাকে  আঘাত করে উত্তর দেওয়ার কি আছে? কতটুকু চেনেন তিনি ওকে? রাগ হজম করে এগিয়ে গেল নিজের দ্বিতীয় প্রশ্নের দিকে।

 

—“আপনার পারিবারিক জীবন সম্বন্ধে বিশেষ কিছুই জানা নেই, সেই সম্বন্ধে একটু বলবেন।”

“আমার কাজের সূত্রেই যখন আমার পরিচয়, তখন পরিবারের সম্বন্ধে  জেনে কি করবেন বলুন তো ?”

 

গুঞ্জা মনে মনে প্রমাদ গুনলো। এই ইন্টারভিউ সে কি করে ছাপবে ম্যাগাজিনে? কোনো প্রশ্নেরই তো উত্তর দিচ্ছেন না ভদ্রলোক।

 

— “গল্পটির পিছনে ইনস্পিরেশন কে? হটাৎ এমন ব্যতিক্রমী একজন মেয়েকে নায়িকা করলেন কেন ?”

এক মিনিট ভালো করে অপলক দৃষ্টিতে তাকে দেখলো লেখক। তারপর  ব্যাকা হাসি হেসে উঠে দাঁড়ালেন “গল্পটা পরে এলে এই প্রশ্নটা করতেন না।  আপনি বরং একটু হোমওয়ার্ক করে আসুন।  When you are ready, we will meet again!”

 

মাথা নিচু করে রইলো গুঞ্জা। মার্বেল পাথরের টেবিলের উপর একটা বই রেখে, পিছনে না ফিরে, গটগট করে হেটে বেরিয়ে গেলেন লবির থেকে লেখক । রাগে, অপমানে গুঞ্জার চোখে জল চলে এলো; এত বছরের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞত্যায় কোনোদিন এমন হয়নি তার সাথে।ব্যাগ গুছিয়ে সে যখন কোনোদিক না তাকিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে হোটেল থেকে, রিসেপশনের মেয়েটি তার পিছন পিছন ছুটে এলো বইটি হাতে নিয়ে।  “ম্যাম , এটা ফেলে যাচ্ছিলেন আপনি।”

 

অপ্রস্তুত ভাবে বইটি ব্যাগে ভোরে ট্যাক্সির ধরে নিজের হোটেলের উদ্ধেশ্যে রওনা দিলো সে।মনে একটাই চিন্তা রয়ে গেল, “কি উত্তর দেবে সে তার বসকে?” ঝাপসা চোখে চেয়ে রইলো বিসতৃত আরব সাগরটির দিকে। 

 

*****

 

রাতে বসের এক ঘণ্টা বকাবকি খেয়ে আর বিশেষ ক্ষিদে বাকি রইলো না গুঞ্জার।  শ্রী অপূর্ব রায়ের ইন্টারভিউ না নিয়ে দিল্লী ফিরলে তার চাকরি যে আর রইবে না, সেটা তার বস পরিস্কার বুঝিয়ে দিয়েছেন। বইটা ব্যাগ থেকে বের করে বিছানার পাশের টেবিল ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে বসলো গুঞ্জা। দোষটা তারই।  হোমওয়ার্ক করে আবার যোগাযোগ করতে হবে লেখকের সাথে। আর কোনো উপায় নেই। 

ভোর রাতে যখন বইটির শেষ পাতায় পৌছালো সেই, আশ্চর্য রকমের একটা অনুভূতি হতে লাগলো তার। সত্যি যেন একটি ব্যতিক্রমী গল্প এটি।  না, কোনো হালকা প্রেমের গল্প তো নয়, এই গল্প এক সজীব, প্রাণবন্ত মেয়ে “ত্রিধা”কে নিয়ে,  যে একটা স্বপ্ন দেখেছিল, দেশের সর্ব সেরা ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট হওয়ায়। তার স্বপ্নপূরণের গল্প এটি।  গল্পের পাতায় পাতায় যেন নিজেকে খুঁজে পেলো সে। সেই তো ত্রিধা! কিন্তু এই গল্প যে তার একার নয়, এ গল্প যেন দেশের প্রতিটি মেয়েকে নিয়ে লেখা যারা গতানুগতিক জীবনের কাছে একটু বেশি কিছু চেয়েছে – একটু এডভেঞ্চার, একটু উচ্ছাস ! যারা সমাজের চিরাচরিত চিন্তাধারার বাইরে গিয়ে চিন্তা করতে শিখেছে, যারা মাথা না নুইয়ে নিজের পরিচয় বানাতে চেয়েছে, যারা কোনোদিন মেয়ে বলে নিজেদের কারো থেকে দুর্বল ভাবেনি, এই গল্প যে তাদের সকল কে নিয়ে ! 

বইটির বন্ধ করে রাখার সময় হটাৎ শেষের পাতায় একটি নীল পেনের লেখা চোখে পড়লো তার। এত অপমান করে আবার স্বাক্ষর দিয়েছেন লেখক! হাসি পেলো গুঞ্জার।  শেষের পাতাটা  উল্টে দেখলো গুঞ্জা। পরিষ্কার হাতের লেখায় লেখা : 

 “ভালো লাগলে জানাস। তোর ফোনের অপেক্ষায় রইলাম। – ঋজুদা”

বুকটা ধড়াস করে উঠলো তার…. ঋজুদা ! অপূর্ব রায় কি তাহলে তার ছদ্মনাম ? সেই চোখদুটো…হঠাৎ তাকে ইন্টারভিউ দিতে রাজি হওয়া…..সেই পরিবার নিয়ে রাখঢাক….এবং গল্পের অনুপ্রেরণা জানতে চাওয়ায় তার প্রতিক্রিয়া….সব যেন ধীরে ধীরে পরিস্কার হতে লাগলো তার কাছে! মনে পড়লো সেই দিনগুলো যখন ঋজুদার বাড়িতে প্রথম এসেছিলো কেবেল টিভি। হাঁ করে দেখতো ওরা  দুজন সেই দুঃসাহসী সাংবাদিক মেয়েটিকে, যে ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের “Live reporting” করছিলো সুদূর বর্ডার থেকে। কি অসামান্য সাহস, কি মনের  বল! গুঞ্জা তো সেই স্বপ্নই দেখেছিল! আর সেই স্বপ্নের ভাগিদার এবং উৎসাহদাতা  ছিল ঋজুদা। তারপর কোথায় হারিয়ে গেল সেই পুরোনো বাড়ি আর পুরোনো সম্পর্কগুলো !

মা বাবার মন রাখতে ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টের বদলে আজ পেজ ত্রি রিপোর্টিং করে গুঞ্জা। চিরাচরিত জীবনের আরাম ও নিরাপত্তার সাথে আপোষ করে নিয়েছিল তার মতো একটি মেয়েও। কিন্তু ঋজুদার চোখে যে এখনো তার স্বপ্নগুলো সজাগ। তার কলমের টানের মধ্যে দিয়ে যেন সেই পুরোনো নিজেকে খুঁজে পেয়েছে সে! 

ঘরের কোনে পরে থাকা মোবাইল ফোনটা তুলে শ্রী অপূর্ব রায়ের নম্বর ডায়াল করলো গুঞ্জা। ভোর রাতে কোনো সেলিব্রিটিকে অকারণে ফোন করে বিব্রত করা তার জার্নালিস্ট এথিক্সের বাইরে। কিন্তু অপেক্ষা করতে মন চাইলো না তার! কথা যে তাকে বলতেই হবে! এই ভোর রাতে নিজে ঘুমোতে যাওয়ার আগে নিজের সুপ্ত স্বপ্নগুলোকে জাগিয়ে তোলাটা যে অনেক বেশি দরকার মনে হলো গুঞ্জার !