Posted in Bengali, short shory

আমি শ্রীজিতা

কলকাতার এক বিশিষ্ট মহিলা কলেজের প্রেক্ষাগৃহ।  শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত এই বিশাল কক্ষটিতে আজ জমায়েত হয়েছে কলেজের সব ছাত্রী। মাইক  হাতে কলেজের অধক্ষ্যা ছাত্রীদের উদ্দেশ্য করে বলছেন-

“আজ আমাদের বিশেষ অতিথি এই কলেজের প্রাক্তন ছাত্রী এবং প্রখ্যাত অভিনেত্রী ও পরিচালিকা শ্রীজিতা মিত্র। তার পরিচালিত সর্বশেষ চলচ্চিত্রটি দেশের এবং বিদেশের নানান সমালোচকদের দ্বারা খুব প্রশংসিত হয়েছে এবং সম্মানিত কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে তার স্ক্রীনিংও হয়েছে। শ্রীজিতার এই সাফল্যে গর্বিত আমরা সকলেই। তাই আজ কলেজের বার্ষিক অনুষ্ঠানে তাকে বিশেষ ভাবে অনুরোধ করা হয়েছে ছাত্রীদের কিছু বলে অনুপ্রেণীত করার জন্যে। আমি এবার মঞ্চে ডেকে নিতে চাই আমাদের সকলের প্রিয় শ্রীজিতা মিত্রকে। “

করতালিতে ফেটে পড়লো সভাঘরটি। বিনীত ভাবে জোড়হাতে স্টেজ উঠে এলেন এক অপুরূপ সুন্দরী মধ্যবয়স্কা মহিলা। পরনে একটি সাদা খোলের উপর কাঁথা স্টিচের রুচিসম্পন্ন শাড়ি ও খোঁপায় দুটি সাদা গোলাপফুল ছাড়া আর কোনো সাজের আতিশয্য নেই।  কেউ ভাবতেই পারবে না ইনি এত বড় একজন অভিনেত্রী। মাইক  হাতে তুলে গলা পরিস্কার করে শুরু করলেন তার বক্তব্য–

“নমস্কার।  আমি শ্রীজিতা।  আমার কাজের সাথে হয়তো আপনারা অনেকেই পরিচিত। তাই সেইসব নিয়ে আজ আর কথা বলবো না।  কিন্তু এই কলেজের ছাত্রীরা যারা আজ জমায়েত হয়েছে আমার কথা শুনতে, তাদের আজকে আমি শোনাবো একটি গল্প। আমার জীবনের গল্প। প্রায় বছর কুড়ি আগে আমিও ছিলাম তোমাদেরই মধ্যে একজন। এই প্রেক্ষাগৃহে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে শুনতাম কত বিশিষ্ট প্রাক্তন ছাত্রীদের ভাষণ। দুচোখে ছিল কত স্বপ্ন, কত ইচ্ছে। ঠিক তোমাদেরই মতন।

ছোটথেকেই অভিনয়ের শখ ছিল।  স্কুল কলেজে অনেক নাটকে অভিনয় করেছি। তারপর সুযোগ পেলাম একটি নামী দলের সাথে স্টেজে নাটক করার। সেই থেকে টেলিভিশনে সিরিয়াল করার সুযোগ পেলাম। নায়িকার ভূমিকা। সেইসব এখন স্বপ্নের মতো মনে হয়।  তখন আমার প্রচুর অনুরাগী। রাস্তায় বেরোলেই লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো সবাই একটি অটোগ্রাফের জন্যে।  শুটিং, পার্টিস, বিদেশ সফর, তারপর কিছু সিনেমায় পার্ট করার সুযোগ….আমি যেন একটি স্বপ্নপুরীতে বাস করছিলাম।

কিন্তু বুঝতে পারিনি যে এই “সেলুলয়েডের ” জগৎটা  কত ঠুনকো, কত সংকীর্ণ। হটাৎ লক্ষ্য করলাম আমার ধীরে ধীরে একটু একটু করে ওজন বাড়তে শুরু করলো। প্রথমে ভাবলাম খাওয়া দাওয়ার অনিয়ম।  খাওয়া নিয়ন্ত্রণ করলাম, ব্যামের সময় বাড়ালাম, রোজ সাঁতার কাটা শুরু করলাম। তার পরও লক্ষ্য করলাম কিছুতেই নিজের ওজন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছি না।  এদিকে আমার ডিরেক্টর/প্রোডিউসারদের মাথায় হাত।  নায়িকা মোটা হলে নাকি সিনেমা চলবে না। কিছুটা বাধ্য হয়েই ডাক্তার দেখলাম। জানতে পারলাম আমার hypothyroidism আছে।  ডাক্তারের কথা মতো চলতে শুরু করলাম কিন্তু তাতেও বিশেষ লাভ হলো না।

ফলস্বরূপ আমাকে সিরিয়াল থেকে বাদ দিয়ে দেয়া হলো।  আস্তে আস্তে সিনেমার অফার পাওয়া বন্ধ হয়ে গেল।  আমি প্রচন্ড ভাবে বিষন্ন হয়ে পড়তে শুরু করলাম ক্রমাগত।  প্রতিটা ইন্টারভিউতে একই প্রশ্ন করা হলো আমাকে। কাগজে আমার চেহারা নিয়ে রম্য রচনা বেরোতে লাগলো। আমি চিৎকার করে সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম যে এটি একটি অসুখ। আমি অসুস্থ। হাসির খোরাক নই। কোনো লাভ হলো না। বাড়িতে ভুয়ো চিঠি আসতে লাগলো, বাংলা চলচিত্রের সবচেয়ে কুৎসিত অভিনেত্রী নাকি আমি।  যারা এতদিন আমার একটি অটোগ্রাফের জন্যে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো, তারা নিমেষে ভুলে গেল আমাকে। এক মুহূর্তে বুঝিয়ে দিলো, আমার চেহারাটাই সব ছিল,  প্রতিভার কোনো দাম নেই।

Stardom জিনিসটাই বড়ো ছলনাময়ী। আজ আছে কাল নেই। এক পলকের মধ্যে লোকে তোমায় আপন করে নিতে পারে, এক পলকে ভুলে যেতে পারে। আমার সাথেও তাই হলো।  কদিনের মধ্যে দেখলাম আমার হাতে কোনো কাজ নেই। এতগুলো বছর অভিনয়ে সমর্পন করার পর অন্য কাজ খুঁজে পাওয়া খুব শক্ত মনে হতে লাগলো। বিধবা মা, ছোট ভাইকে নিয়ে আমার জগৎ। কি করে মা কে বলি যে “মা, তোমার মেয়ে একদিন খুব বড় গলা করে বলেছিলো তোমাকে আর কাজ করতে হবে না, আমিই সব দায়িত্ব নেবো এখন থেকে। কিন্তু আজ আমি আবার বেকার। আমি যে নিজের কাছে নিজেই হেরে গেলাম মা”!

দিনের পর দিন নিজের অন্ধকার ঘরে কাটাতে শুরু করলাম। আয়নায় নিজেকে দেখলে রাগে জ্বলে পুড়ে উঠতাম। নিজেকে ঘেন্না করতে শুরু করেছিলাম। মনে হতো নিশ্চই আমারই ভুল, পুরো দুনিয়া তো আমাকেই দোষারোপ করছে। নিজের পরিবারের সামনে নিজেকে দোষী মনে হতে লাগলো। তারপর যখন দেখলাম আর পারছি না, মনে মনে ভাবলাম এই ব্যর্থ, অসফল জীবনটাকেই শেষ করে দেব।

এই সময়ই একদিন হটাৎ একটা চিঠি বাড়িতে এলো। আমার এক প্রাক্তন ফ্যান আমাকে চিঠি লিখে জিজ্ঞাসা করছে যে আমি অভিনয় করছি না কোনো আর। সে নাকি এখনো আমার ছবির অপেক্ষায় আছে।  প্রথমটা খুব হাসি পেলো। তারপর মনে হলো এই একটি মেয়ে অন্তত আমার চেহারা ছাপিয়ে আমার কাজটাকে মনে রেখেছে তাহলে। ঘরে বসে ভাবতে লাগলাম। কেন আমি অন্যের চোখে নিজের কদর খোঁজার চেষ্টা করছি। কেন অন্যদের এতটা অধিকার দিয়েছি আমার ব্যক্তিগত জীবন, আমার চেহারা, আমার শরীর নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করার। যদি তারা করেও বা , কেন আমি তাদের এতটা গুরুত্ব দেব। নায়িকা সুন্দরী “size 0” হবে কেন সব সময়; চেহারার সাথে গল্প বলার,  চলচ্চিত্রের গভীরতার কি সম্পর্ক ?

আমি ঠিক করলাম আর লুকিয়ে থাকবো না। হেরে যাবো না আর। নিজের জমানো যেটুকু টাকা ছিল তা দিয়ে একটা ছোট বাজেটের সিনেমা বানাবো। তাতে থাকবে না কোনো বড় অভিনেতা, সঙ্গে যুক্ত থাকবে না কোনো বড় নাম।  যদি এখনো এই পৃথিবীতে প্রতিভার কদর থাকে তাহলে অন্তত আজকের মতো একজন অনুরাগী আমায় এসে বলবে “দিদি, খুব ভালো কাজ করেছো”!

সেই সিনেমাটি  সমগ্র বিশ্বে সম্মানিত হলো, হটাৎ একজন নামকরা পরিচালক হিসাবে আমার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লো। যে প্রোডিউসাররা আমাকে একদিন প্রত্যাখ্যান করেছিল তারা ছুটে এলো আমার দোরগোড়ায় আমার সাথে কাজ করার জন্যে। তার মাঝে কিছু “critically  acclaimed” সিনেমাতে প্রমুখ চরিত্রে  অভিনয় করার আবার সুযোগ পেলাম। আজ আমি সাফল্যের শীর্ষে। অথচ একদিন সমাজের চোখরাঙানিকে ভয় পেয়ে লুকিয়ে ছিলাম অন্ধকার ঘরে, শেষ করে ফেলতে চাইছিলাম নিজের জীবনটাকে। কত পাওয়া অসম্পূর্ণ থেকে যেত বলতো!

এই কথাগুলো এই  কারণেই তোমাদের বলছি যাতে তোমরা বুঝতে পারো যে মানুষের চেহারা ছাপিয়ে তার মধ্যেকার প্রতিভাগুলিকে কদর দেয়া অনেক বেশি জরুরি। আজকে যারা বলছে আমাকে ছাড়া বাংলা চলচিত্রের ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যেত তারাই তো একদিন ঠেলে ফেলে দিয়েছিলো আমাকে। তাই নিজের কদর তোমাদের নিজেদের করতে শিখতে হবে, নিজেকে সুস্থ রাখো কিন্তু যারা সুস্থ হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে তাদের কখনো অসম্মান করো না। আর কখনো হার মেনে নিয়োনা। মনে রাখবে রাতের শেষেই কিন্তু দিন থাকে। দিনের আলো দেখার আগেই রণে ভঙ্গ দেয়া কি উচিত?

আমি শ্রীজিতা আর এই আমার গল্প। আমার এই কথাগুলোর মধ্যে দিয়ে যদি আমি তোমাদের মধ্যে একজনকেও অনুপ্রেরণা দিয়ে থাকতে পারি, সেটাই হবে আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমার সবচেয়ে বড় পাওনা। ধন্যবাদ। “

কয়েক মুহূর্তের নিস্তব্দতাকে চীরে ফেটে পড়লো করতালি। গ্রিনরুমের দরজার আড়ালে দাড়িয়ে ফুলের তোরা নামিয়ে রেখে চোখের কোনায় জমে থাকা একবিন্দু  জল মুছে ফেললেন  শ্রীজিতা। হর্ন বাজিয়ে কলেজের গেট থেকে বেরিয়ে গেলেন তার বিদেশি গাড়ি নিয়ে, ফেলে রেখে গেলেন এক ঘর মন্ত্রমুগ্ধ শ্রোতা, জ্বালিয়ে দিয়ে গেলেন তরুণ মনে আশা ও আত্মবিশ্বাসের দীপ।

Advertisements

2 thoughts on “আমি শ্রীজিতা

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s