Posted in Bengali, short shory

এক ঝাঁক ইচ্ছেডানা

চা বাগানে ঘেরা কুয়াশাছন্ন  পাহাড়ের কোলে একটি সুন্দর দ্বিতল  বাড়ি। গেট দিয়ে ঢুকতেই   নুড়ি বিছানো রাস্তার দুধারে সারি দিয়ে ইউক্যালিপ্টাস গাছ এবং  গ্যারেজের  সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দুটো দামি গাড়ি দেখলেই বোঝা যায় বাড়িটির মালিক বেশ অবস্থাপন্ন ।  ছিমছাম রুচিসম্মত ভাবে সাজানো বাড়িটির দোতালায় তিস্তার  ঘর।  ঘরের একপাশে বিশাল বইয়ের আলমারি, তার উপর লাইন দিয়ে সাজানো নানান রঙের ছোটবেলার সফ্ট টয়গুলি। ঘরের এক কোনে ওয়ার্ডরোবটা অবশ্য বইয়ের আলমারি থেকে অনেকটাই ছোট। বিছানার একধারে উপর করে রাখা একটি ইংলিশ নভেল, পাশে ছড়ানো রকমারি বুকমার্ক। নেটের পর্দা লাগানো  বিশাল কাঁচের জানালাগুলির  পাশ দিয়ে সারি দিয়ে  মেঘ ভেসে যাচ্ছে, মন খারাপ করা মেঘ! অন্যদিন অবশ্য এই মেঘগুলি তিস্তার  মন খারাপ করায়না, কিন্তু আজ যেন জানালার পাশে মেঘগুলি জমাট বেঁধেছে তাকে বিদায় জানাতে। তাদের ঘরের মেয়ে যে আর দুদিন পরে চলে যাবে নতুনের উদ্দেশ্যে, তাই বোধহয় মেঘেদেরও  আজ মুখ গম্ভীর।  যাওয়ার ইচ্ছে নেই তিস্তার ও, কিন্তু সে নিরুপায়।

 

দার্জিলিঙের একটি নাম করা স্কুল থেকে I.S.C. পাশ করেছে তিস্তা, জয়েন্ট এন্ট্রান্স এ ভালো rank করে কলকাতায়   ডাক্তারী পড়ার সুযোগ পেয়েছে সে । তার বাবা মাও কলকাতার বাড়িতে তার সাথে থাকবে এখন থেকে । বাবা ব্যবসার সব কাজ সামলাবে কলকাতার থেকে। তার বাবা মায়ের স্বপ্ন, একমাত্র মেয়ে ডাক্তার হবে। সেই স্বপ্ন পূরণ করতেই তাদের সপরিবারে দার্জিলিং ছাড়ার এই সিদ্ধান্ত।  

 

তার নিজের স্বপ্নগুলি অবশ্য একদমই আলাদা। সে চায় লিখতে। নিজেকে কবি  হিসাবে ভাবার দুঃসাহস অবশ্য তার নেই।  সে চায় শুধু  নিজের জন্যে লিখতে। এই জানালার পাশে বসেই তো পড়ার ফাঁকে ফাঁকে পাতার পর পাতা জুড়ে লিখতো সে কবিতা  ।  এই মেঘ, এই চা বাগান, এই পাহাড়, এদের নিয়ে তার কত ছন্দ রচনা করা এখনো বাকি। কিন্তু বাবা মা তা বোঝেন না।  অবশ্য বাড়িতে পার্টি থাকলে তাকে প্রায়ই তার স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করে শোনাতে হতো বাহবা কুড়ানোর জন্যে। কিন্তু বাবা মা বলেন Wordsworth হয়ে পেট ভরবে না, ডাক্তার তাকে হতেই হবে।  অগত্যা ইলেভেনে সাইন্স নেয়া, জয়েন্ট দেয়া আর এখন কলকাতা যাওয়া। 

 kanchanjungha-panorama

ডায়েরিটা  খুলে লিখতে বসলো সে।  নিজের কথা, এই মেঘ, পাহাড়, পাখি, আর চা বাগানের কথা, নিজের ইচ্ছে আর আকাঙ্খার কথা, তার ছোট বেলার দার্জিলিঙের কথা। কি জানি আবার কবে দেখা হবে এদের সাথে, আবার কবে বাড়ি ফেরা হবে।  দুদিন পরে যখন মালপত্র গাড়িতে তুলে, শেষ বারের মতো তাদের মালী লক্ষণ দাজুকে টাটা বলে সে গাড়িতে উঠলো, মন ভরে দেখে নিলো কাঞ্চনজঙ্গার শৃঙ্গটিকে । কদিন কুয়াশায় ঢাকা ছিল কাঞ্চনজঙ্গা, আজ যেন তাকে বিদায়  জানাতেই দেখা দিয়েছে ছলনাময় পর্বতশৃঙ্গটি।   মৌন প্রকৃতি যেন  তাকে বার বার প্রশ্ন করছিল , “আবার কবে দেখা হবে তিস্তা ?”, মনে মনে নিঃশব্দে শপথ করলো  সে “একদিন ঠিক ফিরে আসব “। 

 *******

  

সেই শপথের অবশ্য দশ বছর হয়ে গাছে। তিস্তা এখন Dr (Mrs) . Teesta  Basu  Roy,  কলকাতার একটি নামকরা প্রাইভেট হাসপাতালের সাথে যুক্ত, তার স্বামী তারই কলেজের সিনিয়র, ওই একই হাসপাতালের সাথে যুক্ত। তার বাবা মায়ের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। আলিপুরে সদ্য তৈরী হওয়া বহুতলে পনেরোতলার  উপরে তাদের ঝকঝকে নতুন ফ্ল্যাট। বিশাল কাঁচের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেই দেখা যায় পুরো শহরটা। না,পাহাড়, মেঘ ইত্যাদি দেখা যায়না। কিন্তু সে সবের কথা এখন তিস্তার মনেও পড়েনা। ব্যস্ত মানুষ সে, সকালে উঠে Gym যায়, ব্রেকফাস্ট করেই যে যার গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে  তারা দুজন, সারাদিন তো শ্বাস ফেলার সময় নেই, সন্ধেবেলা সহকর্মীদের বাড়িতে পার্টি না থাকলে বাড়ি ফিরে খুচখাচ কিছু রান্না করে ল্যাপটপ খুলে TV series দেখা। এই ব্যস্ত জীবনের কাজের চাপে দশ বছর আগের তিস্তা এখন হারিয়ে গাছে। সে এখন সামাজিক প্রতিষ্ঠা লাভের জন্য বেপরোয়া শহুরে প্রতিযোগিতায়ে এতটাই মত্ত যে অন্য কিছু নিয়ে ভাবার অবসর এখন আর নেই তার। 

 

পুজোয় কদিনের জন্যে ছুটি পেয়ে তার স্বামী, সৈকত, হটাৎ একটা উদ্ভট প্রস্তাব দিয়ে বসে। ঘুরতে যাওয়ার। প্রথমে তিস্তা ভেবেছিলো সৈকত তাদের ভেনিস যাওয়ার প্ল্যানটাকে নিয়ে নিশ্চই ভাবছে , কিন্তু অবাক হয়ে যায় যখন জানতে পারে সৈকত এত জায়গা থাকতে তার সেই ছোটবেলার দার্জিলিঙে যেতে চায়। আজীবন মুম্বাইয়ে বড় হওয়া সৈকতের দার্জিলিংটা কোনোই দেখাই হয়নি শুনে কিছুটা অনিচ্ছাসত্ত্বেও রাজি হয় তিস্তা। এক মাস পর, একটি হালকা শীতের সকালে দীর্ঘ দশ বছর পর দার্জিলিঙের বসুবাড়িতে ফিরে আসে বাড়ির মেয়ে। লক্ষণ দাজু এখনো বাড়ির দেখাশোনা করে, সেই ইউক্যালিপ্টাস গাছের সারি, নুড়ি বিছানো রাস্তা, সব যেন ঠিক আগের মতো আছে। তার ঘরে ঢুকে জানালার নেটের পর্দা সরিয়ে দাঁড়ালো তিস্তা, সেই দৃশ্য, সেই মেঘ….সবই যেন আগের মতো, কিন্তু কিছু একটা আলাদা। অনেক ভেবেও বুঝতে পারলো না কি আলাদা। স্তব্ধ প্রকৃতি অলক্ষে মাথা নেড়ে ভাবলো, “আমরা তো যুগযুগান্তর ধরে একই আছি, দেখার দৃষ্টিটাই হয়তো পাল্টে গাছে।”

সৈকতের আবদারে তাকে দার্জিলিং ঘোরাতে নিয়ে যেতে হলো তিস্তাকে। ছোটবেলার চেনা রাস্তাগুলো দিয়ে নতুন সঙ্গীর হাত ধরে ঘোরার অনুভূতিটাই যেন আলাদা, সেই পুরোনো ম্যালের রাস্তা, তার স্কুলে যাওয়ার রাস্তা , কেভেন্টার্সের ইংলিশ ব্রেকফাস্ট আর বিকেলে গ্লেনারিসের কফি। সৈকতের মুগ্ধ চোখ দিয়ে যেন নতুন করে দেখছিলো দার্জিলিংকে সে। ঘোরাঘুরির ফাঁকে একদিন হটাৎ পুরোনো বইয়ের আলমারিটা ঘাটতে গিয়ে হাথে পড়লো সেই পুরোনো কবিতার খাতাটা। ছোটবেলার সব স্বপ্ন, সব ভালোলাগা, খারাপ লাগা, চাওয়া পাওয়া যেন একমুহূর্তে চোখের সামনে ভেসে উঠলো তার । কচি হাথে লেখা কবিতাগুলোর মধ্যে দিয়ে যেন ফুটে উঠছিলো আগামীর স্বপ্ন। কিন্তু আজ দশ বছর পরে নিজের একটা স্বপ্নও কি পূর্ণ করতে পেরেছে সে? মনে হলো এই দশ বছর ধরে যে জগৎটা তৈরী করেছে সে, তা তো তার নিজের নয় , তা তো অন্যদের। হটাৎই নিজের কাছে নিজেকে অপরাধী মনে হতে থাকলো তার। কিন্তু এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে, মনে মনে হাসলো সে, ইচ্ছেডানাদের একবার কেটে ফেলে দিলে তাদের কি আর কখনো খুঁজে পাওয়া যায়? এখন যে পথটি নিজের জন্যে বেছে নিয়েছে সে, তা ধরেই এগিয়ে যেতে হবে তাকে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডায়েরিটি ফিরিয়ে রাখলো যথাস্থানে। সৈকত ক্যামেরা নিয়ে রেডি, বেরোতে দেরি হয়ে যাচ্ছে যে !

*******


এক সপ্তাহের ছুটি শেষ করে এবার কলকাতা ফেরার পালা। কবিতার ডায়েরিটা ব্যাগে ভরে নিলো তিস্তা, মনে হলো ফেলে আসা দিনগুলোর সবটুকু যেন সাথে নিয়ে যাচ্ছে সে । পুজোর ছুটির পর সবাই যখন নব উদ্দীপনায় কাজে যোগ দিয়েছে, তিস্তার মন পড়েছিল অন্য কোথাও। হাসপাতাল যেতে তার ইচ্ছে করে না, কাজে মন নেই, সব সময় যেন মন চায় সেই কাঁচের জানালাটার কাছে ফিরে যেতে, সেই পাহাড়ের স্তব্ধতার মধ্যে সান্ত্বনা খুঁজে পেতে। সৈকত ও লক্ষ্য করেছিল এই পরিবর্তনটি। একদিন রাতে ডিনারে বসে তিস্তা মাথা নিচু করে বললো সৈকতকে “আমার কি হলো বল তো , মনে হচ্ছে দার্জিলিং গিয়ে নিজেকে যেন হারিয়েই ফেলেছি ! ” কোনো উত্তর দেয়নি সৈকত।

diary-pen-and-tea-1.jpg

পরেরদিন বিকেলে হাসপাতাল থেকে ফিরে তিস্তা দেখলো টেবিলের উপর রাখা একটি সুন্দর নতুন ডায়েরি আর দামি একটি কলম। অবাক হয়ে ডায়েরিটি খুলে দেখে তাতে সৈকতের হাথের লেখায় “হারিয়ে ফেলোনি, খুঁজে পেয়েছো “। চোখ ঝাপসা হয়ে আসে তিস্তার। তাকিয়ে দেখে শরতের সাদা ফুরফুরে মেঘেরা এসে জমাট বেঁধেছে তার পনেরোতলার বিশাল কাঁচের জানালাটির পাশে। কলম তুলে দীর্ঘ দশ বছর পর লিখতে শুরু করলো তিস্তা। লিখলো কলকাতার মেঘেদের কথা, লিখলো সৈকতের কথা, লিখলো তার দশ বছর ধরে জমে থাকা অনুশোচনা আর ভুলগুলোর কথা। তিস্তার লেখায় এখন তরুণ, পাহাড়ি নদীর স্রোত নেই, প্রাণোচ্ছলতা নেই, আছে গঙ্গার গভীরতা, গাম্বীর্য আর অভিজ্ঞতার ছোঁয়া। মেঘেরা তবুও হাসলো, কারণ শুধু তারাই লক্ষ্য করলো যে নতুন করে খুঁজে পাওয়া ইচ্ছেডানাদের রূপটা এখনো একই রয়ে গেল ! তার লেখায় পাহাড়ি তিস্তার জল যেন এসে মিশলো সমতলের গঙ্গায়। কিন্তু এক রয়ে গেলো সমুদ্রের দিকে ধেঁয়ে চলার ইচ্ছেটুকু !

 
  
Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s