Posted in Bengali, short shory

ফিরে আসা….

কলেজ স্ট্রিটের মোর থেকে কলকাতা বিশ্বাবিদ্যালয় ছাড়িয়ে কিছুটা এগোলেই ছোট্ট একটি বইয়ের দোকান। বইপাড়ার এত বইয়ের দোকানের ভীড়ে হয়তো অনেকেই লক্ষই করবে না এই ছোট, বইয়ে ঠাসা দোকানটিকে।  দোকানের  মালিক এর নাম গঙ্গাধর বাবু।নিতান্ত সাদাসিধে একটি লোক, অত  হৈহুল্লোড় করে ক্রেতা ডাকতে উনি পারেন না।  তাই হয়তো ব্যবসায় কিছুটা পিছিয়েও পড়ছেন। কিন্তু অবাধ জ্ঞান তার বই সম্মন্ধে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এর অনেক অধ্যাপক অনেক সময় আসা যাওয়ার পথে তার সাথে আড্ডা মেরে যেতেন। অনেকে এই নিতান্ত ম্যাট্রিক পাশ দোকানদারের এর বই সম্মন্ধে জ্ঞান দেখে অবাক  হতেন, অনেকে বিরক্ত ও বোধ করতেন। ছোট ব্যবসায় তার অবশ্য কিছু বাধা ক্রেতা ছিল।  তাদের মধ্যে একজন উজ্জ্বল।  প্রেসিডেন্সি কলেজের ইতিহাসের  ছাত্র। কোন একদিন কোন এক দুষ্প্রাপ্য বইয়ের খোঁজে এসে দাঁড়ায় দোকানে।  গঙ্গাধর বাবু বইটি দিতে পারেননি ঠিকই কিন্তু গড়গড় করে বলে দিলেন বইটির লেখক, প্রকাশক এমনকি প্রকাশের সাল। বইটি আনিয়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি ও দেন ।  সেই থেকে মুগ্ধ উজ্জ্বল এর একটি আড্ডার ঠেক  হয়ে যায় গঙ্গাধর বাবুর এই ক্ষুদ্র দোকানটি। উজ্জ্বলের  দু-একটি  উৎসাহী বন্ধুও মাঝে সাঝে যোগ দিতে শুরু করে আড্ডায় ।  নানান দেশের নানান অচেনা লেখক, না পড়া বই নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা আলোচনা চলতো এই প্রবীণ ব্যবসায়ীর সাথে। একদিন এই দোকানেই আলাপ নবনীতার সাথে।
মেডিকেল কলেজ এর মেধাবী ছাত্রী যার পেশা ডাক্তারি হতে চললেও নেশা হয়তো সাহিত্যই রয়ে গেছে ।  গঙ্গাধর বাবুর দোকানের আড্ডার টানে সেও রোজ ছুটে আসতো দোকানে ক্লাস শেষ হলেই। ক্রমেই দুজনের মধ্যে একটি গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে , আর বন্ধুত্ব থেকে প্রেম। ক্লাস , কফি হাউস আর বইয়ের দোকানের আড্ডা নিয়েই যেন কেটে যেতে লাগলো দিন রাত্রি। কিন্তু সব প্রেমই যে পরিণতি পাবে তার কোনো গ্যারান্টী কি আছে ? একদিন কলেজ স্ট্রিটের চেনা গলিগুলো ছেড়ে যখন দুজন যে যার জীবনের উদ্দেশে পারি দিলো, হটাৎই যেন ইতি পড়লো গঙ্গাধর বাবুর দোকানের আড্ডায়।  
দীর্ঘ পঁচিশ  বছর পর উজ্জ্বল যখন দেশে ফিরলো, কলকাতা শহরের চেহারা তখন আলাদা। চারিদিকে পেল্লায় পেল্লায় শপিং মল , শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত বুকস্টরে দেশবিদেশের নানান বই, পাশে কফি টেবিল এ বসে ঘন্টার পর ঘন্টা বই পড়ার সুবর্ণ সুযোগ – নতুন চোখে অবাক হয়ে দেখলো উজ্জ্বল  তার পুরোনো শহরটিকে।  সে অবশ্য কলকাতা এসেছে পাল রাজাদের উপর লেখা তার নতুন বইটিকে লঞ্চ করতে।  এমনি এক বিশাল বুকস্টোরে আজ তার বুকরিডিং আছে।  তার বহুদিনের গবেষণার এবং পড়াশোনার ফল এই বইটি। বুকরিডিং এর শেষে হটাৎই এক বহুপরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে অবাক হলো উজ্জ্বল। ঘুরে তাকালো নবনীতার হাসি মুখের দিকে। এখন সে একজন নাম করা কার্ডিওলজিস্ট , বিবাহিতা, এক ছেলে ক্লাস টেনে  পড়ছে, মেয়েটি ছোট, এখনো ক্লাস ফাইভে । 
বিদেশি কায়দায় তৈরী একটি কফি শপে বসে অনেকক্ষন গল্প চললো, কলেজের সেই সব স্মৃতি, সেই বন্ধুবান্ধব, সেই বইয়ের দোকানে আড্ডা। হটাৎই এক ইচ্ছে মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো। আবার সেই আড্ডার ঠেকে এক গ্লাস চা নিয়ে বসার। কফি শপের কফি আর মলের বুকস্টোরে সেই মজা কোথায়?  উজ্জ্বলের  পরের দিন ফ্লাইট। এক নাম করা বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সে, ব্যস্ত মানুষ। তাই আজই  গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লো দুজন গঙ্গাধরবাবুর দোকানটির খোঁজে। কিন্তু অনেক খুঁজেও তো পাওয়া গেল না দোকানটিকে ! কিছু পুরোনো বইয়ের দোকানে খোঁজখবর করাতে তারা বললো, উনি দোকান বিক্রি করে চলে গেছেন গ্রামে। একজন পুরোনো বই বিক্রেতা দীর্ঘশাস ফেলে বললেন, “আজকাল বই এর দোকানে বই কেনে কে ? আপনাদের সময় এখন আর নেই।  এখন ছেলেমেয়েরা ইন্টারনেট থেকে পড়াশোনা করে , বইও নাকি সেখান থেকে কেনে, তাও আবার অনেক সস্তায়। শপিং মল এর বিশাল বিশাল বিদেশী দোকানের সাথেই বা আমরা টেক্কা দেব কি করে?  বইমেলায় যাওয়াটাও  এখন একটি ফ্যাশন স্টেটমেন্ট মাত্র। এই বাজারে  ছোট ব্যবসায়ীদের পক্ষে ব্যবসা টিকিয়ে রাখাটা আর সহজ নয়।”
পরের দিন যখন উজ্জলের ফ্লাইট টেক অফ করলো শেষবারের মতো দুচোখ বুলিয়ে নিলো ক্রমে ছোট হয়ে আসা  শহরটির উপর।  মর্ডানাইজেশন , উর্বানাইজেশন নিয়ে অনেক লেখা সেই পড়েছে, ভালোদিক খারাপদিক খতিয়ে দেখেছে, তবে একজন ঐতিহাসিক হিসাবে বুঝেছে যে একটি শহর তার আত্মা, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং মানুষকে নিয়েই তৈরি হয়।  গঙ্গাধর বাবুর বইয়ের দোকানটির মতো হটাৎই যেন কলকাতার বইপাড়ার আত্মাটিকেও আর খুঁজে পাচ্ছিলো না সে।  পরের বার যখন ফিরবে হয়তো এক নতুন কলকাতাকে সে দেখতে পাবে। কংক্রিট এর ভীড়ে হারিয়ে যাবেনা তো তার ছোটবেলার শহরটির আত্মাটা ?
নিচের দিকে আবার চোখ ফিরিয়ে দেখলো, মেঘের আড়ালে ঢাকা পরে গাছে তার কলকাতা ।
Picture Source: Internet (Ironically)
Advertisements

2 thoughts on “ফিরে আসা….

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s